বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা
বিশ্লেষকদের মতে, হযরত মুহাম্মদ (সা.) রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখ সকালে জন্মগ্রহণ করেন, যা ছিল সৌরবর্ষ অনুসারে ৫৭১ খ্রিস্টাব্দের ২০ এপ্রিল।
জন্মতারিখ নিয়ে বিশ্লেষণ :
জন্মসাল: একথা স্বীকৃত যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমুল ফিল তথা হস্তি বাহিনীর ঘটনার বছরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং সকল ইতিহাসবিদ ও জীবনীকার এ বিষয়ে একমত।
(আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/৩২১, সিফাতুস সাফওয়া ১/৫১, আরও দেখুন: আর রাউযুল-উনফ ১/৪২৭)
হস্তি বাহিনীর ঘটনার কতদিন পর নবিজী (সা.) এর জন্ম হয়েছিল? এই বিষয়ে অনেকগুলো মত আছে; প্রসিদ্ধতম মত হল, ৫০ দিন পর।
হস্তি বাহিনীর ঘটনার পবিত্র বছরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কেউ বলেন: এক মাস পরে। কারো মতে: পঞ্চাশ দিন পরে। শেষোক্ত মত অধিক প্রসিদ্ধ। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/৩২১)
জন্মমাস: এ প্রসঙ্গে আল্লামা কাসতাল্লানি রহ. (মৃত্যু: ৯২৩ হি.) ছয়টি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন:
(১) মুহররম (২) সফর (৩) রবিউল আউয়াল (৪) রবিউল আখির (৫) রজব (৬) রমজান; তবে অধিকাংশ মানুষ একমত যে, নবি (সা.) রবিউল আউয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হাফিজ ইবনু কাসির রহ. বলেন: অধিকাংশ লোক এ ব্যাপারে একমত যে, তিনি রবিউল আউয়াল মাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/৩২০)
আল্লামা মুহাম্মদ যাহেদ কাউসারি রহ. (মৃত্যু: ১৩৭১ হি.) জন্ম তারিখ নিয়ে বেশ ভালো গবেষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, রবিউল আউয়াল ছাড়া অন্য কোনো মাসের অভিমত বিদগ্ধ গবেষকদের মতে বিশুদ্ধ নয়। (মাকালাতে কাউসারি, পৃ. ৪০৫)
জন্মদিন: ইতিহাসবিদ ও সিরাত গবেষকগণ একমত যে, রাসূল (সা.) এর জন্ম সোমবারে হয়েছে। হাদিসে আছে:
عَنْ أَبي قَتَادَةَ رضي الله عنه: أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم صلى الله عليه وسلم سُئِلَ عَنْ صَومِ يَوْمِ الاِثْنَيْنِ، فَقَالَ: «ذَلِكَ يَومٌ وُلِدْتُ فِيهِ، وَيَومٌ بُعِثْتُ، أَوْ أُنْزِلَ عَلَيَّ فِيهِ.
রাসুলুল্লাহ (সা.) কে সোমবার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: এটাই সেই দিন, যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং যেদিন আমাকে পাঠানো হয়েছে। (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং. ১১৬২, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/৩১৯)
জন্মতারিখ: রবিউল আউয়াল মাসের কত তারিখে নবিজী (সা.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন?
এ সম্পর্কে বেশকিছু আলেম বলেন, দিনটি রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার ছিল; কিন্তু তারিখ নির্ধারণ করা সম্ভব হয় নি। অন্যদিকে অধিকাংশ আলেম বলেন যে, তারিখটি নির্ধারিত। তাহলে কত তারিখ ছিল সেটা ?
আল্লামা ক্বাসতাল্লানি রহ. এই বিষয়ে মোট সাতটি মতামত উল্লেখ করেছেন: (১) রবিউল আউয়ালের দ্বিতীয় দিন, (২) অষ্টম দিন, (৩) দশম দিন, (৪) দ্বাদশ দিন, (৫) সতেরতম দিন, (৬) আঠারোতম দিন, (৭) বাইশতম দিন। (আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যাহ ১/১৪০-১৪২)
আল্লামা কাউসারি রহ. বলেন: (১) অষ্টম তারিখের শেষে নবম তারিখ, (২) দশম তারিখ, (৩) দ্বাদশ তারিখ। এই তিনটি বক্তব্য ব্যতীত অন্য চারটি বক্তব্য উল্লেখ করার মতো নয়। সুতরাং এখন পুরো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো, এ তিনটি বর্ণনার মধ্যে সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য কোনটি।
দশম তারিখের বর্ণনা :
ইবনে সাদ (মৃত্যু: ১৬৮ হি.) এই হাদিসটি মুহাম্মদ বাকির (মৃত্যু: ১১৪ হি.) এর থেকে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এর বর্ণনাকারী তিনজন আছেন; যাদের ব্যাপারে সমালোচনা (كلام) রয়েছে। তাই দশ তারিখ সংক্রান্ত হাদিসটি অগ্রাধিকারযোগ্য নয়। আল্লামা কাউসারি রহ.ও এই হাদিসটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। হাদিসটি তাবাকাত থেকে বর্ণিত। ইবনে সা’দ রহ. বলেন: আমি মুহাম্মদ বিন উমর বিন ওয়াকিদ আল আসলামি। তিনি বলেন: আবু বকর বিন আবদুল্লাহ বিন আবি সাবরা আমরা নিকট বর্ণনা করেছেন, তিনি ইসহাক বিন আবদুল্লাহ বিন আবি ফারওয়াহ থেকে, তিনি আবু জা’ফর মুহাম্মদ বিন আলী (যিনি মুহাম্মদ আল বাক্বীর নামে পরিচিত) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (সা.) রবিউল আউয়াল মাসের দশ দিন পরে জন্মগ্রহণ করেন। সুতরাং হাতির ঘটনা এবং নবিজি (সা.) এর পবিত্র জন্মের মধ্যখানে পঞ্চান্ন রাত ছিল।
(আত তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সা’দ ১/১০০)
দ্বাদশ তারিখের বর্ণনা :
এই উক্তিটি মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক রহ. (মৃত্যু: ১৫১ হি.) বর্ণনা করেছেন; কিন্তু তিনি এর পক্ষে কোন সনদ উপস্থাপন করেননি। যদিও উক্তিটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং মক্কার লোকেরা প্রাচীনকাল থেকে এই তারিখে জন্মদিনের অনুষ্ঠান করে আসছে। এবং এই দিনে সারা বিশ্বে জন্মদিনের অনুষ্ঠান ও সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়; তবে এই দিনে জন্মগ্রহণ করার কোনো প্রমাণ নেই। মুস্তাদরাকে হাকিমে (মৃত্যু: ৪০৫ হি.) আছে: আবুল হাসান মুহাম্মদ বিন আহমদ বিন শাবউইয়্যাহ আমাদেরকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: জাফর বিন মুহাম্মদ নিশাপুরি আমাদের নিকট থেকে, তিনি বলেন: আলী ইবনে মিহরান আমাদের নিকট থেকে, তিনি সালামাহ ইবনে ফজল মুহাম্মদ বিন ইসহাকের সূত্রে আমাদের নিকট বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আল্লাহর রাসুল (সা.) রবিউল আউয়াল মাসের দ্বাদশ রজনীর শেষে জন্মগ্রহণ করেন।
(আল মুসতাদরাক আলাস সহীহাইন, সংখ্যা: ৪১৮৩)
মুত্তাসিল সনদে না হওয়ায় এই রেওয়ায়েতটিও দলিলযোগ্য নয় এবং এর অবস্থা সেইসব বর্ণনার মতো, যেগুলোর সনদ নেই।
নবম তারিখের উক্তি :
যুক্তিসঙ্গত ও দালিলিকভাবে এই কথাকেই প্রাধান্য দেওয়া যায় যে, রাসুল (সা.) অষ্টম তারিখ শেষ হয়ে নবম দিনে জন্মগ্রহণ করেন।
বর্ণনাগত দিক:
১. আল্লামা ইবনে আব্দিল বার (মৃত্যু: ৪৬৩ হি.) এই বিষয়ে মতবিরোধ উল্লেখ করার সময় সর্বপ্রথম এই মতটি বর্ণনা করেন। আবু উমর বলেন: কখনও বলা হয়: রবিউল আউয়াল মাসের অষ্টম রাত শেষ হয়ে, আবার কেউ কেউ অন্য তারিখও বলেন। (আল ইসতিআব, ইবনে আবদিল বার ১/৩০)
২. হাফিজ ইবনে কাসির রহ. বলেন: এটাও বলা হয় যে, অষ্টম তারিখের শেষে, যা হুমাইদী ইবনে হাজম থেকে বর্ণনা করেছেন। এবং মালিক, আকিল, ইউনুস ইবনে ইয়াজিদ ও অন্যান্যরা জুহরি থেকে, আর তিনি মুহাম্মদ ইবনে জুবায়ের ইবনে মুত'ইম থেকে বর্ণনা করেছেন। আর ইবনে আব্দিল বার ইতিহাসবিদদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা এটিকে সহীহ বলেছেন। এবং হাফিজ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিযমি এর সাথে একমত হয়েছেন এবং হাফিজ আবুল খাত্তাব ইবনে দিহয়া তাঁর কিতাব "আত তানবির ফি মাওলিদিল বাশির ওয়ান নাযির" এ এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/৩২০)
৩. হযরত মাওলানা হিফজুর রহমান (মৃত্যু: ১৩৮২ হি.) লিখেছেন: লোকমুখে প্রচলিত মত হলো, দিনটি ছিল ১২ রবিউল আউয়াল আর কিছু দুর্বল বর্ণনা এটিকে সমর্থন করে। এবং অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম বলেছেন যে, দিনটি ছিল ৮ রবিউল আউয়াল। তবে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য মত হলো, ৯ রবিউল আউয়াল নবিজীর জন্ম তারিখ। ইতিহাস ও হাদিসের বিখ্যাত পণ্ডিতগণ এবং দীনের মহান ইমামগণ এই তারিখটিকে সঠিক এবং প্রমাণিত বলেছেন। সুতরাং হামিদী, আকিল, ইউনুস বিন ইয়াজিদ, ইবনে আবদুল্লাহ, ইবনে হাযম, মুহাম্মদ বিন মুসা আল খাওয়ারিযমি, আবুল খাত্তাব ইবনে দিহয়া, ইবনে তাইমিয়া, ইবনে কাইয়িম, ইবনে কাসির, ইবনে হাজার আসকালানি এবং শায়খ বদরুদ্দিন আইনি রহ. এর মতও এটি। (কাসাসুল কুরআন ৪/২৫৩)
৪. আল্লামা সায়্যেদ সুলাইমান নদবিও নবম তারিখ হওয়াকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। (রহমাতুল্লিল আলামিন ১/৩৮-৩৯)
যুক্তিসঙ্গত দিক:
১. মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিযমি (মৃত্যু: ২৩৫ হি.) জ্যোতির্বিদ্যার একজন মহান ইমাম। উপরের আলোচনায় তাঁর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২. গণিতের মহান পণ্ডিত, মিশরীয় জ্যোতির্বিদ আল্লামা মাহমুদ পাশা (মৃত্যু: ১৩০২ হি.), "ইসলামপূর্ব আরবদের ক্যালেন্ডার" বিষয়ের উপর ফরাসি ভাষায় একটি অতুলনীয় বই সংকলন করেছেন। এবং আল্লামা আহমদ জাকি পাশা (মৃত্যু: ১৩৫৩ হি.) এটিকে আরবি ভাষায় অনুবাদ করেছেন, যার নাম
نتائج الأفهأم في تقويم العرب قبل الإسلأم و في تحقيق مولد النبي و عمره عليه الصلاة و السلام
বিশ্বের বেশ কয়েকজন জ্যোতির্বিদদের বক্তব্য বিবেচনায় নিয়ে এই বইটিতে করা গবেষণা থেকে এটিও সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, দিনটি ছিল নয় তারিখ। (নাতায়িজুল আফহাম পৃষ্ঠা: ২৮-৩৫)
তারা যে কারণগুলি উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে একটি হল:
আল্লাহর রাসুল (সা.) এর পবিত্র যুগে ১০ হিজরি সনের শাওয়াল মাসের শেষ দিনে একটি সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। একই দিনে তাঁর পুত্র হযরত ইব্রাহিম (রা.) ইন্তেকাল করেন।
হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন (মৃত্যু: ১৮৫২ হি.): নবি (সা.) এর পুত্র ইব্রাহিমের মৃত্যুর দিন। অধিকাংশ সিরাত গবেষক উল্লেখ করেছেন যে, তিনি হিজরি দশম বছরে মারা গেছেন। এবং বেশিরভাগের মত হলো, মাসের দশম দিনে এটা ঘটেছিল। (ফাতহুল বারী ২/৫২৯)
যদি আমরা এখান থেকে উল্টো দিকে হিসাব করি, তাহলে প্রমাণিত হবে যে, নবি মুহাম্মদ (সা.) এর পবিত্র জন্ম হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখে। কারণ এটা সর্বসম্মত মত যে, সোমবার তাঁর জন্মের দিন এবং এটি হস্তির পবিত্র বছরের রবিউল আউয়াল মাসের ৯ তারিখে পড়ে। আল্লামা মাহমুদ পাশা ফালাকি বলেন: সকলে একমত যে, জন্ম সোমবারেই হয়েছিল এবং যেহেতু সোমবার এই মাসের নবম তারিখ ব্যতিত অষ্টম ও দ্বাদশ তারিখের মধ্যে পাওয়া যায়না, তাই সোমবার দিনের বিপরীতে জন্মের তারিখ বিবেচনা করা সম্ভব নয়।
হযরত মাওলানা হিফজুর রহমান লিখেছেন: মাহমুদ পাশা ফালাকি (কনস্টান্টিনোপলের একজন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও জ্যোতিষী) হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর যমানা থেকে তাঁর সময় পর্যন্ত চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের সঠিক হিসাব বের করার জন্য অনুমান নির্ভর একটি 'জন্মতারিখ গবেষণাপত্র' সংকলন করেছেন। এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, তাঁর জন্মের বছরে সোমবার কোনো গণনা অনুসারে ১২ রবিউল আউয়ালে পড়ে না; বরং ৯ রবিউল আউয়ালে পড়ে। অতএব বর্ণনার দৃঢ়তা ও নির্ভুলতা এবং রাশিফল ও নক্ষত্রের গণনার বিবেচনায় পবিত্র জন্মের নির্ভরযোগ্য তারিখ হলো, ৯ রবিউল আউয়াল।
(কাসাসুল কুরআন ৪/২৫৩)
৩. প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও লেখক শায়খ আলী তানতাবি রহ. (মৃত্যু: ১৪২০ হি.) উপরোল্লিখিত কিতাব 'نتاءج الأفهام' এর একটি সংস্করণের উপর পর্যালোচনা লিখেছেন। সেখানে তিনি বইটির লেখকের মত ৯ রবিউল আউয়ালকে তাঁর পবিত্র জন্মের দিন হিসেবে ঘোষণা করে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেছেন। (মুকাদ্দামাতে ত্বানতাওয়ী-৮৩)
৪. বিশিষ্ট হাদিস বিশারদ ও মুহাক্কিক শায়খ আহমদ শাকির (আহমদ বিন মুহাম্মদ আব্দুল কাদের, মৃত্যু: ১৩৭৭ হি.) শায়খ মাহমুদ পাশা ফালাকির গবেষণাটি গ্রহণ করেছেন এবং সূর্যগ্রহণ নির্ণয়ে তার সাহায্য চেয়েছিলেন।
("আল মুহাল্লা বিল আছার" ৫/১১৪-১১৫ এর হাশিয়াতুশ শায়খ আহমদ শাকির, মৃত্যু: ৪৫৬ হি.)
৫. সৌদি আরবের একজন গবেষক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিম (মৃত্যু:১৪১৬ হি.), তার "তাক্বউয়ীমুল আযমান" গ্রন্থে লিখেছেন: এটি লিপিবদ্ধ আছে, সঠিক বর্ণনায় কোন সন্দেহ নেই যে, তিনি ২০ এপ্রিল ৫৭১ খ্রীস্টাব্দে হস্তিবছরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং জ্যোতির্বিদ্যার উপর ভিত্তি করে এবং এর উপর ভিত্তি করে যে, তার জন্ম ছিল সোমবারে, জন্ম ও মৃত্যুর সঠিক তারিখ জানা সম্ভব। যা ছিল হিজরতের পূর্বে ৫৩ সনের ৯ই রবিউল আউয়াল মোতাবেক ৫৭১ সনের ২০ই এপ্রিল। (তাক্বউয়িমুল আযমান পৃষ্ঠা: ১৪৩, প্রথম সংস্করণ)
আরও দ্রষ্টব্য: (১) দারুত তাইয়্যিবা, রিয়াদ কর্তৃক প্রকাশিত মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল আওশানের "মাশা'আ ওয়ালাম ইয়াসবুত ফিস সিরাতিন নাবাউয়্যা" কিতাবে "নবির জন্মের সংজ্ঞা" শীর্ষক একটি বিস্তারিত প্রবন্ধেও উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে শায়খ আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিমের উপরোক্ত অংশ ছাড়াও অন্যান্য উলামায়ে কেরামের বক্তব্যের আলোকে নবম তারিখটি বেশি সম্ভাব্য বলে বিবৃত করা হয়েছে।
(২) এই বিষয়ে আল্লামা মুহাম্মদ যাহিদ কাউসারি রহ. রচিত "আল মাওলিদুশ শরীফ আন নববি" শিরোনামে একটি সংক্ষিপ্ত ও গবেষণাপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মাহমুদ পাশা ফালাকির উপরোক্ত কিতাব থেকেও উপকৃত হয়েছেন এবং লেখক সম্পর্কে মর্যাদাপূর্ণ মন্তব্য লিখেছেন।
দেখুন: (মাকালাতে কাউছারী, পৃষ্ঠা: ৪০৫-৪০৮, আল আনওয়ার প্রেস, কায়রো থেকে প্রকাশিত)
(৩) দারুল উলুম লন্ডনের শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা মুফতি উমর ফারুক লোহারভী দা.বা. রচিত "আল্লাহর রাসুল (সা.) এর জন্ম তারিখ" শিরোনামে অত্যন্ত বিশ্লেষণধর্মী ও তথ্যবহুল প্রবন্ধ "ফিকহি জাওয়াহির" (খণ্ড: ১/পৃষ্ঠা: ৬৮-৭১) গ্রন্থে রয়েছে। প্রবন্ধগুলিতে আকাবির আলেমদের মন্তব্য রয়েছে। যাদের মধ্যে দারুল উলূম দেওবন্দের শায়খুল হাদিস ও সদরুল মুদাররিসীন হযরত মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ.ও রয়েছেন।
সতর্কতা:
কতিপয় আলেম অষ্টম তারিখের মতটি গ্রহণ করেছেন। তবে লক্ষ্য করা উচিত, অষ্টম ও নবম তারিখের দুটি মতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। একটির ব্যাখ্যা হযরত মাওলানা হিফজুর রহমান সাহেবের, তা এই যে, রবিউল আউয়ালের অষ্টম এবং নবম তারিখের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। মাওলানা লিখেছেন : ৮ এবং ৯ এর মধ্যে প্রকৃত কোনো পার্থক্য নেই বরং এটি মাসের ২৯ ও ৩০ তারিখের গণনার উপর ভিত্তি করে, যখন গণনা দ্বারা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, সঠিক তারিখ ২১শে এপ্রিল ছিল, তখন আট তারিখ সম্পর্কিত সমস্ত মতামত প্রকৃতপক্ষে নয় তারিখের সমর্থনে উপস্থাপন করা যেতে পারে। (কাসাসুল কুরআন ৪/২৫৪)
জন্মের সময় :
জীবনীগ্রন্থগুলিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, নবি (সা.) ভোরবেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সাধারণত, মক্কায় ২০শে এপ্রিল ভোর ৪:৩৯ মিনিটে ফজর উদিত হয়। অতএব বলা যেতে পারে যে, নবি (সা.) ৫৭১ খ্রিস্টাব্দের ২০শে এপ্রিল সোমবার আনুমানিক ভোর ৪:৪০ মিনিটে এই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন।
সারকথা:
উপরোক্ত বিবরণের ফলাফল হলো, ঐতিহাসিক ও যুক্তিগত উভয় দিক থেকেই নবি (সা.) এর জন্মের নির্ভরযোগ্য তারিখ হলো, রবিউল আউয়াল মাসের নবম তারিখ।
এ থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ (সা.) ৫৭১ সালের ২০ এপ্রিল মুতাবেক ৯ই রবিউল আউয়াল সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন। (নাতায়িজুল আফহাম, পৃ. ৩৫)
জন্মস্থান:
জমহুরের মতে তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অবস্থান সম্পর্কে তিনটি মত রয়েছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মত হলো যে, তিনি শিআবে বনি হাশিমে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এটি একটি বিখ্যাত স্থান এবং অনেক বছর আগে লোকেরা এখানে পর্যটনে আসত। কয়েক বছর আগে সৌদি সরকার এই সুযোগ বন্ধ করে দেয় এবং সেখানে একটি গ্রন্থাগার নির্মাণ করে।
নবিজী (সা.) জন্মগ্রহণ করেন বনু হাশেমের একটি প্রসিদ্ধ শাখা গোত্রের গলিতে অবস্থিত পবিত্র ঘরে। যেটি যুকাকুল মাওলিদ নামে পরিচিত। (সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ১/৩৩৮)
মক্কার পূর্ব দিকে অবস্থিত, আজ অবধি যা পর্যটন ও বরকত হাসিলের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে সমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। (তারিখুল খামিস ফী আহওয়ালি আনফুসিন নাফিস ১/১৯৮)
তারতিব ও তাখরিজ: ওয়াইস গুধরী
জামিয়া ইসলামিয়া তা'লিমুদ্দীন, গুজরাট।
ভাষান্তর : মাওলানা মাহমুদ হাসান
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
নবিজি (সা.) এর মাদানি রাজনীতি: কিছু দৃষ্টিভঙ্গি ড. মাওলানা সাইয়্যেদ আহমাদ ইউসুফ বিন্নুরি (গত ৯ মার্চ ২০২৩ শুক্রবার ড. মাওলানা সাইয়্যেদ আহমাদ ইউসুফ বিন্নুরি(হযরত মাওলানা ইউসুফ বিন্নুরি রহ. এর নাতি ও জামিয়া বিন্নুরি টাউন, করাচির নায়েবে মুহতামিম) নবি করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর "Political Life" (রাজনৈতিক জীবন) বিষয়ে "Institute Of Business Management" (ইনস্টিটিউট অব বিজনেস ম্যানেজম্যান্ট) এ ছাত্রদের উদ্দেশ্য বক্তব্য রেখেছেন। তাখাসসুস ফি উলুমিল হাদিসের ছাত্র মুহাম্মাদ তায়্যিব হানিফ উক্ত বক্তব্যটি রেকর্ড করে লিখন-শৈলীতে ঢেলে সাজিয়েছেন। অধিক কল্যাণ বিবেনায় পাঠকবৃন্দের উদ্দেশ্যে এখানে পত্রস্থ করা হচ্ছে।)