বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
নবিজি (সা.) এর মাদানি রাজনীতি: কিছু দৃষ্টিভঙ্গি ড. মাওলানা সাইয়্যেদ আহমাদ ইউসুফ বিন্নুরি (গত ৯ মার্চ ২০২৩ শুক্রবার ড. মাওলানা সাইয়্যেদ আহমাদ ইউসুফ বিন্নুরি(হযরত মাওলানা ইউসুফ বিন্নুরি রহ. এর নাতি ও জামিয়া বিন্নুরি টাউন, করাচির নায়েবে মুহতামিম) নবি করিম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর "Political Life" (রাজনৈতিক জীবন) বিষয়ে "Institute Of Business Management" (ইনস্টিটিউট অব বিজনেস ম্যানেজম্যান্ট) এ ছাত্রদের উদ্দেশ্য বক্তব্য রেখেছেন। তাখাসসুস ফি উলুমিল হাদিসের ছাত্র মুহাম্মাদ তায়্যিব হানিফ উক্ত বক্তব্যটি রেকর্ড করে লিখন-শৈলীতে ঢেলে সাজিয়েছেন। অধিক কল্যাণ বিবেনায় পাঠকবৃন্দের উদ্দেশ্যে এখানে পত্রস্থ করা হচ্ছে।)
প্রিয় ছাত্রবৃন্দ! নিকট অতীতেও নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বরকতপূর্ণ আলোচনা এবং তাঁর সিরাতের বর্ণনা এমনই এক চিত্তাকর্ষক বিষয় ছিল যে, এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচিত সময় ও স্থান সাধারণভাবে সমগ্র মানবতার জন্য এবং বিশেষ করে মুসলমানদের জন্য ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে বিরাট কল্যাণ বয়ে আনে।
কবি শব্দের মাধুরী দিয়ে কত সুন্দর স্মৃতিচারণ করেছেন :
شأم شہرِ ہول میں شمعیں جلا دیتا ہے
تو یاد آکر اس نگر میں حوصلہ دیتا ہے
ভয়াল শহরের গৌধূলিতে তুমি ,
জ্বালাও মোমের বাতি ।
তোমার স্মৃতি এই শহরে ,
সাহস জোগায় আমার হৃদয়ে ।
- মনির নিয়াজি
অধুনা মুসলিম উম্মাহ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নানান সমস্যা ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি। অনস্বীকার্য বাস্তবতা হলো, বর্তমান সময়ে আমরা প্রকৃতার্থে মহান আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাতলানো আদর্শের উপর আছি বলে মনে হয় না। কিন্তু 'মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম' শিরোনামের এই সমাবেশগুলো মুসলমানদের দ্বীন, ঈমান ও রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ভালোবাসার অবিচ্ছেদ্য অংশের সর্বোত্তম উদাহরণ। সমাজের সেই মানুষগুলো সৌভাগ্যবান, যারা মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত ও তাঁর শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন।
সুতরাং, সি.বি.এম. (C.B.M) এর প্রশাসন ও সংলাপ সোসাইটির কর্মকর্তা এবং উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলী মহান আল্লাহ তাআলার খাস রহমতের ওসিলা, যাঁরা এই বক্তৃতা সেমিনারের আয়োজন করেছেন।
সিরাতের মুজিযা
মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আলোচনা এবং তাঁর জীবনের বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনা আমাদের উদ্দীপনাকে উজ্জীবিত করে; অন্যদিকে পবিত্র সিরাত সম্পর্কে আলোচনা করার সময় এটি একটি বড় অসুবিধা হয়ে দাঁড়ায় যে, কীভাবে তা সম্পূর্ণরূপে ব্যক্ত করা যায়? এবং কীভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের বিভিন্ন দিক শ্রোতাদের সামনে উপস্থাপন করা যেতে পারে?
যখন সায়্যিদা আয়েশা সিদ্দিকা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) এর নিকট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র ও গুণাবলির বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অর্থবহ বাক্যে উত্তর দিয়েছিলেন: (كان خلقه القرآن) ("কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র")
(মুসনাদে আহমাদ: ৪২/ ১৮৩, হাদিস নং: ২৫৩০২)
"অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের সম্পূর্ণ বিবরণ কুরআন।" "অর্থাৎ, কুরআনে যা কিছু আছে, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার জীবন্ত ও বাস্তব প্রতিচ্ছবি ছিলেন।"
সাইয়্যেদ আতাউল্লাহ শাহ বুখারী (রহ.) উক্ত হাদীসের একটি চমৎকার বিশ্লেষণ করতেন: "যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত হলো কুরআন এবং আল্লাহ্ রব্বুল আলামীনের সর্বশক্তিমান সত্তা, এটিকে ২৩ বছরের দীর্ঘ সময়ে অবতীর্ণ করেছেন; তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব যে, একটি মাত্র বৈঠকে তাঁর জীবনের সবগুলো দিক তুলে ধরা যাবে!"
তবে, মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত চর্চার অলৌকিকতা হলো, তাঁর জীবনের কয়েকটি দিক যদি ইখলাসের সহিত বর্ণনা করা হয়, তবুও তা এমন আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায় যে, সমস্ত অন্ধকার দূরীভূত হয়ে যায়।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমি তাঁর 'রাজনৈতিক জীবন' (Political Life) সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।
সিরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পূর্ণতা
এটি শুধু আমাদের ভক্তি নয়, আমাদের আকিদাও বটে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবন ছিল সর্বদিক থেকে পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ। এটি তাঁর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে, তাঁর জীবনীতে আমরা জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনামও পাথেয় পাই।
যেখানে তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে সফলতার সহিত ব্যবসা করেছেন, সেখানে একজন আদর্শ স্বামী হিসেবেও উত্তম ভূমিকা পালন করেছেন।
শিক্ষা ও শিক্ষাদানে তিনি যে মানদণ্ড স্থাপন করেছেন তা অতুলনীয়, এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে তাঁর কোনো জুড়ি নেই।
নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রজ্ঞাপূর্ণ ও দূরদর্শী রাজনীতি
তদ্রূপ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও কৌশল। (Political Behavior) এবং রাজনৈতিক কৌশলসমূহের ন্যায়সঙ্গত বিশ্লেষকবৃন্দকে এবং অমুসলিমদেরকে আজো পর্যন্ত বিস্মিত হতে দেখা যায়। ভেবে দেখুন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া শুরু করেন এবং সাফা পাহাড় থেকে মানুষদেরকে সম্বোধন করেন, তখন তিনি ছিলেন একজন নিঃসঙ্গ ব্যক্তি। মক্কায় ইসলাম বিদ্বেষীদের মাঝে তিনি ১৩ বছর অতিবাহিত করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে (Political Activism) অংশ নেননি; বরং তিনি শুধু ইখলাসের সহিত দাওয়াতি ধাঁচে মানুষদেরকে ইসলামের প্রাণস্পর্শী বার্তা শুনিয়েছেন। এরপর মদিনায় মাত্র ১০ বছর শাসক হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন।
নবিয়ে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাজনৈতিক কৌশলের পরিপূর্ণতা দেখুন, যে দাওয়াতের সূচনা হয়েছিল একজন নিঃসঙ্গ ব্যক্তির মাধ্যমে, ২৩ বছর পর, তাঁর পবিত্র তিরোধানের সময়, আজকের আধুনিক ইউরোপের সমপরিমাণ আরব উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড তাঁর নেতৃত্ব ও শাসনের অধীন ও অনুগত হয়ে গিয়েছিল।
এটি নিছক ভক্তিবাদ নয়; এক কালজয়ী ও অনস্বীকার্য বাস্তবতা
এরপর সাহাবায়ে কেরাম" রাদিয়াল্লাহু আনহুম" অল্প কিছুবছরের মধ্যেই সে সময়কার দুই পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য, "রোমান সাম্রাজ্য" (Roman Empire) এবং "পারস্য সাম্রাজ্য "(Persian Empire) কে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেন।
আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা মাত্র ৫০ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে বিস্তৃত হয়ে পড়ে তিনটি মহাদেশে।
শত্রুদের স্বীকৃতি
"নাইন-ইলেভেন" আমাদের যুগের একটা বড় ঘটনা। এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
ঐ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাজনৈতিক সফলতা এক ‘Miricle’ (মু'জিজা)। যদিও ঐ প্রতিবেদনের প্রতিটি বিষয়ের সাথে একমত হওয়া সম্ভব নয়; তবু এটুকু বিষয় গভীরভাবে চিন্তার দাবি রাখে যে, চৌদ্দশত বছর পর আজও বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো, যেমন "যুক্তরাষ্ট্র" সরকারিভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাজনৈতিক সাফল্য একটি ‘মুজিযা’ (অলৌকিক সাফল্য)।
অমলিন ছাপ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার আরেকটি সূক্ষ্ম দিক হলো, তাঁর রাজনীতির প্রভাব চিরস্থায়ী ও অমলিন।
ইতিহাসে রাজনৈতিক সাফল্যের বহু দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। অগণিত সাম্রাজ্য ইতিহাসের মঞ্চে উদিত হয়েছে, অসংখ্য বিশ্বজয়ীর কাহিনী মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। বহু রাজনৈতিক মতবাদ ও দর্শন নানা অঞ্চল জয় করে প্রভাব বিস্তার করেছে।
কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যায়, এই সব সাফল্য, বিজয় ও দর্শনগুলোর স্থায়িত্ব ছিল না। সময়ের স্রোতে তাদের সব চিহ্ন ধীরে ধীরে মুছে গেছে।
আমাদের অনেকেই "সিকান্দর-ই-আযম" (আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট) নামটির সঙ্গে পরিচিত। তাঁর বিজিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাবের একটি বড় অংশও ছিল। এমনকি করাচি বন্দর থেকে শুরু করে হায়দ্রাবাদ পর্যন্ত তাঁর বিজয়যাত্রার চিহ্ন ইতিহাসে পাওয়া যায়।
তবুও এই সমস্ত বিজয় ও ঐশ্বর্যের গৌরব স্থায়ী হয়নি। তাঁর শাসনাধীন বিস্তৃত ভূখণ্ড আজ সঙ্কুচিত হয়ে শুধু একটি ছোট দেশ ইউরোপের "গ্রীস" (Greece)-এ সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
রোম সাম্রাজ্য (Roman Empire) নিয়ে বহু আলোচনা শোনা যায়। রোম সাম্রাজ্যে প্রচলিত রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতিধ্বনি আজও আইনজীবী মহলে (legal fraternity) গুঞ্জরিত হয়। পাশ্চাত্যের প্রভাবে বিকশিত বহু বিদ্যা ও কলায় রোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই বিরাট সাম্রাজ্য আজ ইতিহাসের ‘কাহিনী’তে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তার রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের প্রতীক হিসেবে অবশিষ্ট রয়েছে কেবল একটি ছোট্ট দেশ; "ইতালি" (Italy)। তার অধীনস্থ অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে এখন আর কোনো চিহ্ন বা প্রভাব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
কিন্তু দেখুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাষ্ট্রনীতির পরিপূর্ণতা দেখুন, আন্দালুস (Spain) ব্যতীত, যেখানে খ্রিষ্টানদের নিকৃষ্টতম নিপীড়নের (Persecution) শিকার হতে হয়েছিল মুসলমানদের, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব অঞ্চল বিজয় করেছিলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও সেগুলো আজও ইসলামের অনুসারীদের দ্বারা ভরপুর। তন্মধ্যে ইরাক, ইরান ও প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের কিছু অঞ্চল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উপমহাদেশের ক্ষেত্রে যদিও এ কথা সত্য যে, এখানে সর্বত্র মুসলিম শাসন অব্যাহত থাকেনি, তথাপি পাকিস্তানের মত একটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এখানে জন্ম নিয়েছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশও, তার সমস্ত রাষ্ট্রীয় বিচ্যুতি সত্ত্বেও, মুসলিম দেশ হিসেবে টিকে আছে। এমনকি বর্তমান ভারতের মধ্যেও মুসলমানদের প্রভাব ও উপস্থিতি বিদ্যমান; যার রাজনৈতিক প্রভাব অনস্বীকার্য। এসবই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাজনৈতিক জীবনের মু'জিজা ।
ইতিহাসের প্রভাবশালী ব্যক্তি
আমাদের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যারা আছেন, সাধারণত, আমেরিকান লেখক মাইকেল এইচ. হার্ট (Michael H. Hart) এর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ "The 100: A Ranking of the Most Influential Persons in History" সম্পর্কে তাদের অনেকেরই জানাশোনা আছে ।
উক্ত বইয়ে লেখক এমন ১০০ জন ব্যক্তির তালিকা করেছেন, যাদের তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশাশী ব্যক্তি মনে করেছেন এবং যাদের কারণে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে।
উক্ত তালিকার শীর্ষে তিনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে স্থান দিয়েছেন। তিনি তার বইয়ে ব্যাখ্যা করে লিখেছেন:
“আমি আপনাকে (মুহাম্মদকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে) কেবল একজন নবি হিসেবে নয়; বরং মৌলিকার্থে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি হিসেবে তালিকার প্রথম স্থানে রেখেছি।”
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাজনৈতিক জীবন এবং উম্মতের জ্ঞানের অগ্রাধিকার
এটি যেহেতু আমার পিএইচ.ডি-র বিষয়ও ছিল, তাই আমি এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি যে, এই শতাব্দীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রাজনৈতিক জীবনকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে যত বই লেখা হয়েছে এবং লেখা হচ্ছে, সম্ভবত খুব কম বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে এত গভীরভাবে কলম ধরার আগ্রহ দেখানো হয়েছে।
বিভিন্ন জ্ঞানচর্চাকেন্দ্রের (School of Thought) চিন্তাবিদগণ আমাদের মুসলিম সমাজে এমন সব দল ও গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছেন, যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনকে যথাযথভাবে উপস্থাপন ও ব্যাখ্যা (Interpretation Reflection) করাকে জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়ে নিয়েছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে আহরিত রাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে মুসলমানদের রাজনৈতিক জীবনকে যতটা সম্ভব সংগঠিত করা।
এর এক বাস্তব পরিণতি আমরা দেখি ১৯২৩ সালের সেই সময়ে, যখন মুসলিম শাসন কোথাও অবশিষ্ট ছিল না; কিন্তু কয়েক দশকের মধ্যে প্রায় ৬০টির মতো স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গড়ে ওঠে।
আমরা মানছি যে, এসব ইসলামি দেশ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা শক্তির বিবেচনায় বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর তালিকায় নেই; কিন্তু আজ তারা এমন এক স্তরে পৌঁছেছে, যদি সাহসিকতার সাথে তারা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব নয়। নিঃসন্দেহে এটা নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সেই বিস্ময়কর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ফল, ১৪ শতাব্দী পরও প্রভাব স্পষ্ট দৃশ্যমান।
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আজও ইসলাম-বিদ্বেষীরা নবিজির জীবনী নিয়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করে, সেটি হলো তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রম। বহু সমসাময়িক আলোচনার পেছনেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রাজনৈতিক শিক্ষার ছায়া বিদ্যমান, যেমন: জিহাদের বাস্তবতা , ইসলামি রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের অধিকার (Minority right), গণতন্ত্রের বৈধতা ইত্যাদি। এসব এমন গবেষণার বিষয়, যেগুলোর মুখোমুখি আমরা আজ একাডেমিক পরিসরে হচ্ছি।
এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব না হলেও, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাজনৈতিক জীবনী থেকে প্রাপ্ত কিছু শিক্ষনীয় বিষয় উল্লেখ করাটা আমাদের জন্য উপকারী হবে, ইনশাআল্লাহ।
প্রকৃত রাজনীতি ও সমাজের দূষিত প্রভাব
প্রথমেই বুঝে নিতে হবে, আমাদের দেশে রাজনীতিকে জনগণের কাছে নিকৃষ্টভাবে কলঙ্কিত করা হয়েছে। একদিকে কিছু বিশেষ গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে রাজনীতিবিদদের এমন ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে যে, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উপস্থাপন করা তাঁর পবিত্রতার পরিপন্থী বলে মনে হয়। অন্যদিকে রাজনীতির লক্ষ্য ও পথ দুটিই পূর্ণতা পায় ক্ষমতা ও প্রভাব দ্বারা। ক্ষমতার গতিবিদ্যার (Power Dynamics) কিছু নিজস্ব দাবি রয়েছে, যেগুলোকে নৈতিক নীতিমালার (Moral Principles) উপর প্রতিষ্ঠা করা স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটার সমান।
এই কারণে রাজনীতি ও ইসলামের সংমিশ্রণ বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। তবে মনে রাখতে হবে, রাজনীতির মূল ভিত্তি হলো মানুষের সামাজিক শৃঙ্খলার উন্নতি এবং দুর্বলদের কল্যাণ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনা ও বাণী থেকে বোঝা যায়, পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে নবিরা এই কাজ সম্পন্ন করে এসেছেন। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা উচিত যে, নবি তাঁর মৌলিক পরিচয়ে রাজনৈতিক নেতা নন; বরং তিনি আল্লাহর চিরন্তন ও অনন্ত বাণীর প্রতি আহ্বানকারী। কোনো ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণের জন্য তিনি রাজনীতির ময়দানে পদার্পণ করতে পারেন, কিন্তু তাঁর শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য রাজনীতির সংকীর্ণ পরিসরে সীমিত থাকা নয়। রাজনৈতিক সাফল্যকে ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু মনে করা একটি বিভ্রান্তি।
ইসলামে রাজনীতির প্রকৃত অবস্থান
রাজনীতির আসল অবস্থান ইসলামে তখনই নির্ধারিত হয়, যখন আল্লাহ কোনো জাতিকে ক্ষমতা ও সুযোগ দান করেন। তখন তাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নির্দেশনাগুলো পালন করা আবশ্যক । যেমন কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে:
﴿الَّذِينَ إِنْ مَكَّنّٰهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَآتَوُا الزَّكٰوةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ﴾
“তারা এমন লোক, যদি আমি তাদেরকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দিই, তাহলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সকল কাজের পরিণাম তো আল্লাহর কাছেই।”
(সূরা হজ, আয়াত ৪১)
“সুতরাং ‘إِن مَّكَّنَّاهُمْ’ (যদি তাদেরকে ক্ষমতা দিই) এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, শাসনক্ষমতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই প্রদান করা হয়, এবং এই ক্ষমতা লাভ করার পর মুসলমানরা পরবর্তী দায়িত্ব ও বিধানগুলো পালন করতে বাধ্য।
এখানে সংক্ষেপে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- থেকে বর্ণিত রাজনৈতিক কিছু শিক্ষণীয় বিষয় উপস্থাপন করা হলো।”
ইসলামে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রাজনৈতিক চিন্তা- চেতনার প্রতীক হল খিলাফত। এরপর খিলাফতের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে যে পরিমাণ লেখা রচিত হয়েছে তা অত্যন্ত ভারী ও জটিল; বিশদ বিবরণে পূর্ণ। বিস্তারিত আলোচনায় না গেলেও এটুকু বোঝা উচিত যে, খিলাফতের মূল শিক্ষা ও মর্ম হল: মুসলিম শাসকগণ ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা নিজেদেরকে আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি (নায়েব) মনে করবে এবং সেই অনুযায়ী আল্লাহর সামনে নিজেদেরকে জবাবদিহিতার উপযুক্ত মনে করবে।
সুতরাং, ইসলামি শিক্ষার প্রেক্ষাপটে সকল নাগরিক অধিকারের প্রকৃত ভিত্তি এই যে, আমরা যেহেতু আল্লাহর বান্দা, তাই আমাদের শাসকরাও আল্লাহর দাসত্বের সাথে সাথে আল্লাহর বান্দাদের সাথে রাষ্ট্রীয় সমস্ত দায়িত্ব পালন করবেন। যেখানে আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন যে, পদ ও দায়িত্ব বণ্টনের সময় যোগ্যতা ও সামর্থকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, সেখানে প্রেক্ষাপট হিসেবে আল্লাহ তাআলার সাথে কৃত অঙ্গীকারকে ভিত্তি বানানো হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ ফরমান :
"إِنَّ اللّٰهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا"
"(হে মুসলিমগণ!) নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারকে আদায় করে দেবে.।
" (সূরা আন-নিসা, আয়াত ৫৮)
ইসলামি শাসনব্যবস্থার মৌলিক দিক সমূহ
যেহেতু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লা ন্যায়পরায়ণ, তাই তাঁর প্রতিনিধি শাসকরাও ন্যায়বিচার করবে; যেহেতু আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রতি দয়াশীল, তাই মুসলিম শাসকরাও দয়ালু ও করুণাময় হবেন। কারণ, শাসকের উপর দায়িত্ব থাকে আল্লাহর রাজত্বকে পৃথিবীতে বাস্তব শাসনে রূপান্তরিত করা। তার অন্তর হবে নবুয়তের আলোতে আলোকিত এবং সে সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে।
এর বাস্তব প্রতিফলন ইসলামি ইতিহাসে পাওয়া যায় : সাধারণ প্রজাদেরও এমন সাহস ছিল যে, সে দাঁড়িয়ে হজরত উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে জিজ্ঞেস করতে পারত “আপনার পোশাকে অতিরিক্ত চাদর কোথা থেকে এলো"?
(ই’রামুল মুআক্কিইন : ৩/৪৩৪)
ইসলাম ও গণতন্ত্র
এখানে একটি স্পর্শকাতর বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া মুনাসিব মনে করছি যে, মানুষ দুই চরমপন্থায় পড়ে গিয়ে গণতন্ত্র ও খিলাফতের মধ্যে টানাহেঁচড়ায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। যদিও উভয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে; জাতীয় কল্যাণ ও জনজবাবদিহিতার ক্ষেত্রে উভয়ের মাঝে একাধিক দিক থেকে মিলও রয়েছে। শ্রেনীগত বিভাজনের ফলে দুর্বলদের অধিকার হরণ থেকে মুক্তি পাওয়াই উভয়ের উদ্দেশ্য।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র বাণী:
عَنْ عَائِشَۃَ رَضِيَ اللہ عَنْہَا اَنَّ قُرَيْشًا اَہَمَّہُمْ شَأنُ الْمَخْزُوْمِيَّۃِ الَّتِيْ سَرَقَتْ، فَقَالُوْا: مَنْ يُّکَلِّمُ فِيْہَا رَسُوْلُ اللہِ صَلَّی اللہُ عَلَيْہِ وَسَلَّمَ ؟، فَقَالُوْا: وَمَنْ يَّجْتَرِئُ عَلَيْہِ إِلَّا أسَامَۃُ بْنُ زَيْدٍ حِبُّ رَسُوْلِ اللہِ صَلَّی اللہُ عَلَيْہِ وَسَلَّمَ فَکَلَّمَہٗ أسَامَۃُ، فَقَالَ: اَتَشْفَعُ فِيْ حَدٍّ مِّنْ حُدُوْدِ اللہِ؟ ثُمَّ قَأم فَاخْتَطَبَ، فَقَالَ: إِنَّمَا اَہْلَکَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِکُمْ أنَّہُمْ کَانُوْا إذا سَرَقَ فِيْہِمُ الشَّرِيْفُ تَرَکُوْہُ، وَإذا سَرَقَ فِيْہِمُ الضَّعِيْفُ اَقَامُوْا عَلَيْہِ الْحَدَّ، وَاَيْمُ اللہِ: لَوْ اَنَّ فَاطِمَۃَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَہَا.
"তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোকেও এই কারণে ধ্বংস করা হয়েছিল যে, যখন তাদের মধ্যে কোনো সম্মানিত ব্যক্তি চুরি করত, তারা তাকে ছেড়ে দিত; আর যখন দুর্বল ও অসহায় কেউ চুরি করত, তারা তার ওপর (চুরির) শাস্তি প্রয়োগ করত। মনে রেখো! আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কন্যা ফাতিমা ও চুরি করত, আমি তার হাতও কেটে দিতাম।" (সহিহুল বুখারী : ২/ ৪১০ , হাদসি নং : ৩৪৭৫)
যে যুগে রাজাদেরকে আল্লাহর ছায়া বা অবতার বলে মনে করা হতো, সে যুগে শাসকদের মনে এই অনুভব জাগ্রত করা যে, তারা আল্লাহর বান্দা এবং তাদের অবশ্যই জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে জীবন যাপন করতে হবে, এটি ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে সংঘটিত একটি বিপ্লব, যা তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।
আল্লামা ইকবাল এ সম্পর্কে তাঁর কবিতা “ابلیس کی مجلس شوریٰ”- তে বলেন:
اس سے بڑھ کر اور کیا ہوگا فکر وعمل کا انقلاب
پادشاہوں کی نہیں اللہ کی ہے یہ زمین
"চিন্তা ও কর্মে এরচেয়ে বড় বিপ্লব আর কী হতে পারে!
এই যমিন রাজা-বাদশার নয়; কেবল আল্লাহ্র! "
ধাপে ধাপে কাজ করার কৌশল
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল যে, তিনি বিভিন্ন বিধান ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতেন। আমাদের সমাজে সাধারণত মানুষ বিপ্লবপ্রিয় হয়ে থাকে এবং দ্রুততম সময়ে পরিবর্তনের প্রত্যাশা করে থাকে; কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রীতিকে মোটেই পছন্দ করেননি।
হজরত আয়িশা (রাযি.) বলেন:
‘যদি প্রথমেই মদ হারামের বিধান নাযিল হতো, এবং তা সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর করা হতো, তবে সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.) এর মত আত্মোৎসর্গকারী ব্যক্তিদের জন্যও এই নির্দেশ মানা সহজ হতো না।’ মদ হারাম হওয়া সম্পর্কিত কুরআনে বর্ণিত বিধান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করেছেন। সুতরাং, যারা রাজনৈতিক অঙ্গনে জড়িত, তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যেকোনো সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা। আমাদের সমাজে এটি একটি "গুণ" হিসেবে বিবেচিত হয় যে, কেউ দায়িত্ব গ্রহণ করার পর হঠাৎ বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা। অথচ এই আচরণ ভয়ঙ্কর এবং বিপজ্জনক। সিরাতের শিক্ষা হলো, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ধীরে ধীরে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ অবলম্বন করতে হবে।
গন্তব্য নয়; নির্দিষ্ট পথও গুরুত্বপূর্ণ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা খুব স্পষ্ট: কোনো রাজনৈতিক মতবাদ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না যদি তা অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে লক্ষ্যে পৌঁছাতে চায়। "লক্ষ্য পূরণের জন্য যে কোনো উপায় অবলম্বন করা বৈধ" (Ends justify the means) এই নীতি ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।
কুরআন মাজীদের সুরা আল-ফাতহ-এ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ফাতহে মক্কা-র মতো বিজয় কেবল তখনই বৈধ, যখন মুসলমানরা তাকওয়া অবলম্বন করে। কেননা বিরোধী দলের জুলুম-অবিচার মুসলমানদের জন্য অবৈধকে বৈধ করে না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ ফরমান :
"وَأَلْزَمَهُمْ كَلِمَةَ التَّقْوَىٰ وَكَانُوا أَحَقَّ بِهَا وَأَهْلَهَا"
“আল্লাহ মুসলমানদের তাকওয়ার বাণীর উপর অবিচল রাখলেন; আর তারাই এটার সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত ও যোগ্য ছিল।” (আল- ফাতহ: ২৬)
প্রতিপক্ষের অবিচারকে নিজের পক্ষে যুক্তি হিসেবে পেশ করা জাহেলি যুগের স্লোগান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রাজনীতির একটি সোনালী নীতি ছিল, মুসলমানদের যদি যুদ্ধে পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হয় অথবা প্রতিপক্ষের সাথে সন্ধি করতে হয়, তবে তা মেনে নেওয়া উচিত; কিন্তু শুধুমাত্র এই যুক্তিকে ভিত্তি করে কারও ওপর নিজের প্রভাব বিস্তার করা যে, “ভালোবাসা ও যুদ্ধে সবকিছু বৈধ” (Everything is fair in love & war) এটি ইসলামি রীতিনীতি ও মূল্যবোধের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী “الحرب خدعة” (যুদ্ধ হচ্ছে কৌশল/প্রতারণা)–এর সঠিক অর্থ হলো, যখন একবার নিয়মকানুন মেনে যুদ্ধ শুরু করা হয়, তখন শত্রুকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যেকোনো কৌশল প্রয়োগ করা বৈধ । স্বাভাবিকভাবে, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে কোনো পক্ষ প্রতিপক্ষকে জানিয়ে দেয় না যে, আক্রমণ কখন করা হবে, দিনের আলোয় নাকি হঠাৎ রাতের অন্ধকারে। তবে যুদ্ধের ভিত্তি অবশ্যই নৈতিক দাবিদাওয়ার প্রতি লক্ষ্য রেখে হতে হবে। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিজয় ও সাফল্যের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা ছিল নৈতিক মূল্যবোধের।
"ইসলাম তরবারির জোরে পরিচিতি লাভ করেছে "এই প্রোপাগান্ডার বাস্তবতা
আজও মানুষের মাথায় এই ভুল ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তলোয়ারের জোরে সারা বিশ্বে বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছেন। কিন্তু তাহলে কেউ কি আমাদের বলতে পারবে যে, মদিনা কীভাবে বিজয় হয়েছিল? যে শহর থেকে ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনা হয়েছিল, সেটি কোন শক্তি ও বল প্রয়োগে পরাস্ত হয়েছিল? পুরো শহর তো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ব্যক্তিত্বের মায়ায় মোহিত হয়ে গিয়েছিল। তাঁকে স্বাগত জানাতে মানুষের ঢল নেমেছিল। সেই রাষ্ট্র মদিনাতেই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বার্থে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে লিখিত চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, যা “মিসাক-ই-মদিনা” (মদিনা সনদ)নামে পরিচিত। রাষ্ট্রীয় সংবিধানের ইতিহাসে যে অগ্রগণ্য মর্যাদা এই চুক্তিকে দেওয়া হয়, তা অনস্বীকার্য।
পরামর্শের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা
তিনি ছিলেন আল্লাহর নবি এবং সরাসরি আল্লাহর তত্ত্বাবধানে নবুওতের দায়িত্ব পালন করতেন। এই হিসেবে তিনি কারও পরামর্শ গ্রহণে বাধ্য ছিলেন না। তথাপি তাঁর সিরাত সাক্ষ্য দেয় যে, কুরআন মাজীদের বিধান অনুযায়ী সর্বদা তিনি সাহাবায়ে কেরাম(রাঃ)কে পরামর্শে শরিক করতেন এবং পরামর্শের প্রতি উৎসাহ দিতেন। এমনকি বদরের যুদ্ধে স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তিনি পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কুরআন কারীমে সাহাবায়েকেরামের বৈশিষ্ট্য এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে,(وأمرهم شورى بينهم) “তাদের কাজকর্ম পরস্পরের পরামর্শের মাধ্যমে পরিচালিত হয়”। (আশ-শুরা : ৩৮)
অতএব, যখন ইসলামের ভিত্তিতে কোনো সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে, তার মৌলিক নীতিমালা হবে পারস্পরিক পরামর্শ।
সংখ্যালঘুদের প্রতি সদাচরণ
আমাদের সংখ্যালঘুদের সাথে কেমন আচরণ করা উচিত? এ ব্যাপারে আমাদের জন্য আদর্শ হলো সেই আচরণ যা রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের পর দেখিয়েছেন। যদিও মক্কা বিজয়ে সংখ্যালঘুতে পরিণত হওয়া সেই দলটি ছিল এমনসব ব্যক্তিদের নিয়ে, যারা মুসলমানদের সাথে অবিচারের বেদনাদায়ক ইতিহাস তৈরি করে রেখেছিল। কুরাইশের সেই সব ব্যক্তিরা, যাদের সাহসী ও শক্তিশালী হিসেবে গণ্য করা হতো, সেদিন তারা ভয়ে কাঁপছিল।
এ সময় রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু একটি কথাই বলেছিলেন:
"يا معشر قريش! ما ترون أني فاعل بكم؟"
হে কুরাইশবাসী! তোমাদের কী ধারণা, আমি তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করব?”
তারা বলল: “ভালো আচরণ (করবেন বলে আশা করি)। আপনি একজন মহৎ ভাই এবং মহান ভাইয়ের সন্তান।” (أخ كريم وابن أخ كريم)
রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন : “আমি তোমাদের সেই কথা বলব যা ইউসুফ (আ.) তার ভাইদের বলেছিলেন:لا تثريب عليكم اليوم اذهبوا فأنتم الطلقاء “আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, যাও, তোমরা সবাই মুক্ত।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর সিরাত আমাদেরকে এ শিক্ষা দেয় যে, আমাদের অধীনস্থ সংখ্যালঘুরা যেন আমাদেরকে ভয় না পায় ; বরং তারা যেন এই অনুভূতি নিয়ে জীবনযাপন করে যে, তাদের নিজেদের সমাজব্যবস্থার চেয়ে ইসলামি সমাজব্যবস্থাতেই তাদের অধিকার ভালোভাবে রক্ষা হবে।
এগুলো হলো সেসব দৃষ্টিভঙ্গি, যেগুলো দ্বারা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর রাজনৈতিক জীবন থেকে শিক্ষা পাই। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রত্যাশা, তিনি যেন আমাদেরকে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত থেকে উপকৃত হওয়ার এবং তার উপর আমল করার তাওফিক দান করেন। সেইসব সমাবেশ ও সেইসব যুবসমাজ সবসময় যেন সক্রিয় ও প্রফুল্ল থাকে,যারা আজকের এই কঠিনতম পরিস্থিতিতেও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর সিরাতের সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক রাখেন।
اللّٰهم صل علی سیدنا ومولانا محمد النبي الأمي وعلٰی آلہٖ وصحبہٖ بعدد کل شيء ما تحبہٗ و ترضاہ
উদ্ধৃতিসমূহ :
১. মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নম্বর: ২৫৩০২, মুআসসাসাতুর রিসালাহ: খণ্ড ৪২, পৃষ্ঠা ১৮৩
২. মাইকেল এইচ হার্ট লিখেছেন:
My choice of Muhammad to lead the list of the world’s most influential persons may surprise some readers and may be questioned by others, but he was the only man history who was suprerdly successful on both the religious and secular levels. (THE 100: A RANKING OF THE MOST INFLUENTIAL PERSONS IN HISTORY, Page no 3, Kensington,1978)
৩. সূরা হজ্জ, আয়াত নম্বর: ৪১
৪. সূরা নিসা, আয়াত নম্বর:৫৮
৫. ই’লামুল মুআক্কিইন – ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (হাম্বলী): খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৩৪
৬.
عَنْ عَائِشَۃَ رَضِيَ اللہ عَنْہَا اَنَّ قُرَيْشًا اَہَمَّہُمْ شَأنُ الْمَخْزُوْمِيَّۃِ الَّتِيْ سَرَقَتْ، فَقَالُوْا: مَنْ يُّکَلِّمُ فِيْہَا رَسُوْلُ اللہِ صَلَّی اللہُ عَلَيْہِ وَسَلَّمَ ؟، فَقَالُوْا: وَمَنْ يَّجْتَرِئُ عَلَيْہِ إِلَّا أسَامَۃُ بْنُ زَيْدٍ حِبُّ رَسُوْلِ اللہِ صَلَّی اللہُ عَلَيْہِ وَسَلَّمَ فَکَلَّمَہٗ أسَامَۃُ، فَقَالَ: اَتَشْفَعُ فِيْ حَدٍّ مِّنْ حُدُوْدِ اللہِ؟ ثُمَّ قَأم فَاخْتَطَبَ، فَقَالَ: إِنَّمَا اَہْلَکَ الَّذِيْنَ مِنْ قَبْلِکُمْ أنَّہُمْ کَانُوْا إذا سَرَقَ فِيْہِمُ الشَّرِيْفُ تَرَکُوْہُ، وَإذا سَرَقَ فِيْہِمُ الضَّعِيْفُ اَقَامُوْا عَلَيْہِ الْحَدَّ، وَاَيْمُ اللہِ: لَوْ اَنَّ فَاطِمَۃَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَہَا.‘
ভাষান্তর : মাওলানা ফখরুদ্দিন ফাহিম
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা