বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
আদর্শ সমাজ বিনির্মাণে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর ভূমিকা মুফতি আব্দুল কাইয়ুম হাফিজাহুল্লাহ
মানুষ একটি সামাজিক প্রাণী। একাকী জীবন ধারণ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আদিকাল থেকে মানুষ সমাজে বসবাস করে আসছে। কিন্তু কেবল মানুষসমষ্টি একত্রিত হয়ে বসবাস করার নাম আদর্শ সমাজ নয়; সমাজকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন ন্যায় , সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ,দয়া, সহযোগিতা ও আল্লাহভীতির সুদৃঢ় ভিত্তির উপর গড়ে তোলা।
মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মানব জাতির হেদায়েতের জন্য অসংখ্য নবি ও রাসুল পাঠিয়েছেন, যারা সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন।
কিন্তু সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল হলেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি কেবল আরব সমাজের সংস্কারক ছিলেন না, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্য আদর্শ জীবনব্যবস্থার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছিলেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন
لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة لمن كان يرجو الله واليوم الآخر وذكر الله كثيرا
নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুলের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ তার জন্য যে আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করে। (সূরা আহযাব - ২১)
এই আয়াত প্রমাণ করে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু ধর্মীয় নেতা নন; বরং একজন পূর্ণাঙ্গ সমাজ সংস্কারক, যার জীবনে রয়েছে মানবসভ্যতার সর্বোত্তম পথনির্দেশ।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিশন
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিশন কেবল নবুয়তের পর শুরু হয়নি, নবুয়তের আগ থেকেই তিনি সমাজ সংস্কারে সক্রিয় ছিলেন। তার প্রমাণ হলো হিলফুল ফুজুল।
মক্কার সমাজে তখন অন্যায় ও বৈষম্য ব্যাপকতা লাভ করেছিল। একজন ইয়েমেনি ব্যবসায়ীকে কুরাইশের প্রভাবশালী ব্যক্তি আস বিন ওয়ায়েল বিন হিশাম অন্যায়ভাবে হক থেকে বঞ্চিত করলে মক্কার কিছু ভালো মানুষ আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে একত্রিত হন। তারা সিদ্ধান্ত নেন, মক্কায় কারো উপর অন্যায় করলে সবাই মিলিত হয়ে তাকে প্রতিরোধ করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন যুবক ছিলেন এবং এই চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। চুক্তিতে অংশগ্রহণ করে নবুয়তের পূর্বেই তিনি ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক সমাজ সংস্কারের প্রতি আগ্রহী হওয়ার প্রমাণ পেশ করলেন। এই চুক্তি ইতিহাসে হিলফুল ফুজুল নামে পরিচিত।
বহু বছর পর ইসলাম আসার পরেও তিনি এই চুক্তির প্রশংসা করে বলেছিলেন:
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لقد شهدت مع عمومتي حلفا في دار عبد الله بن جدعان٬ ما أحب أن لي به حمر النعم ولو دعيت به في الاسلأم لأجبت
আমি আমার চাচাদের সঙ্গে আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে একটি চুক্তিতে অংশগ্রহণ করেছিলাম (হিলফুল ফুজুলে) । এটি আমার কাছে লাল উট পাওয়ার থেকেও প্রিয়। যদি আমাকে ইসলামে এ ধরনের চুক্তির জন্য ডাকা হয় আমি অবশ্যই সাড়া দিব। (সুনানে কুবরা লিল বায়হাকি - ৬/৪৭)
এটি প্রমাণ করে নবুয়তের আগে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও মানবিক সমাজ সংস্কারে সক্রিয় ছিলেন।
নবুওয়াতের পরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সমাজ সংস্কারে ভূমিকা
হিলফুল ফুজুল চুক্তির মাধ্যমে ন্যায় ও মানবাধিকারের প্রতি যে স্পষ্ট ভূমিকা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ করেছিলেন, নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তিনি তার সর্বোচ্চ বাস্তবায়ন করেন।
মক্কা পর্বে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নানা বাধা, নির্যাতন ও সামাজিক বয়কটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবুও তিনি সমাজ সংস্কার ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের যে ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তা ইসলামি সভ্যতার মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
১. তাওহীদের ভিত্তিতে সমাজ গঠন
মক্কার মানুষ বহু দেব-দেবীর পূজা করত। কুসংস্কার ও শিরকে নিমজ্জিত ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রথম আহ্বান ছিল এক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি।
কুরআনে বলা হয়েছে:
قل يا أيها الناس إني رسول الله إليكم جميعا الذي له ملك السماوات والأرض لا إله إلا هو يحيي ويميت
বলুন: হে মানবজাতি! আমি আল্লাহর রাসূল তোমাদের সকলের নিকট প্রেরিত রাসুল যার জন্যই আসমানও জমিনের সাম্রাজ্য তিনি ছাড়া আর কোন উপাসনা নেই তিনি জীবন দেন এবং মৃত্যু দেন। (সূরা আল- আ'রাফ - ২৫৮)
তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, তাওহীদ ছাড়া সমাজে ন্যায় ,শান্তি ও সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।
২. শিরক ও কুসংস্কার মুক্ত সমাজ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছিলেন:
عن أبي هريرة رض من قال لا إله إلا الله دخل الجنة
যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে,সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহীহ বুখারী – ১২৮)
এ কথার দ্বারা তিনি মানুষকে বুঝিয়েছেন-সমাজ সংস্কারের প্রথম শর্ত হলো, মূর্তি পূজা, কুসংস্কার ও শিরক থেকে মুক্ত থেকে এক আল্লাহর ইবাদত করা।
শিরক ও মূর্তিপূজা থেকে মুক্ত করা ছিল তাঁর সমাজ সংস্কারের মূল লক্ষ্য। কারণ মূর্তিপূজার কারণে সমাজে অশান্তি জুলুম ও বৈষম্য ছড়িয়ে পড়েছিল।
৩. ন্যায় ও সাম্যের ভিত্তিতে সমাজ গঠন
মক্কার সমাজে ধনী-গরিব বৈষম্য প্রবল ছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেন :
يا أيها الناس إن ربكم واحد وإن أباكم واحد" ألا لا فضل لعربي على أعجمي ولا لأعجمي على عربي ولا لأحمر على أسود ولا لأسود على أحمر إلا بالتقوى
হে মানুষ! নিশ্চয়ই তোমাদের রব একজন এবং তোমাদের পিতা একজন। কোন আরবের অনারবের উপর, অনারবের আরবের উপর, শ্বেতাঙ্গের কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের শ্বেতাঙ্গের উপর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই। শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি হবে কেবল তাকওয়া। (সুনানে বাইহাকী - ৪৭৬২)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :
إن أكرمكم عند الله أتقاكم
নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সে,যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। (সূরা আল- হুজুরাত : ১৩)
৪) শিক্ষা ও জ্ঞান প্রসারে ভূমিকা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম সমাজে জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের জন্য জ্ঞান অর্জনকে ফরজ ঘোষণা করেছেন। হাদিসে আছে:
طلب العلم فريضة على كل مسلم
জ্ঞান অর্জন প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরজ। (ইবনে মাজাহ – ২২৪)
এটি সমাজে সচেতনতা, সমঝোতা এবং নৈতিকতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়, অন্যায় ও কুসংস্কার নির্মূল করে।
৫) অর্থনৈতিক ন্যায় ও সামাজিক কল্যাণ
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অর্থনৈতিক দিক থেকেও সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন।
দারিদ্র্য বিমোচন, যাকাত বিতরণ, ব্যবসায় সততা এবং দারিদ্র্যহীন সমাজ গঠনের জন্য তিনি দিক নির্দেশনা দিয়েছেন ।
কুরআনে আল্লাহ বলেন:
خذ من أموالهم صدقة تطهرهم وتزكيهم بها
তাদের সম্পদ থেকে সাদাকাহ নাও যা তাদেরকে পাক ও পবিত্র করবে। (সুরা তাওবা - ১০৩)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
ما نقصت صدقة من مال
সদকা সম্পদ কমায় না । (মুসলিম – ২৫৮৮)
এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫) পরিবার ও সামাজিক বন্ধন
আদর্শ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হলো পরিবার ও সামাজিক বন্ধন। পরিবারে সুসংহত সম্পর্ক না থাকলে সমাজে স্থায়ী শান্তি, ন্যায়,এবং নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবারের প্রতি সদাচরণ এবং সামাজিক সম্পর্ক রক্ষায় সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
(ক) মাতা-পিতার প্রতি সদাচরণ
পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা, দয়া এবং তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্ব নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার জোর দিয়ে বলেছেন।
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন –
رضا الله في رضا الوالد ،وسخط الله في سخط الوالد
আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টির মধ্যে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টির মধ্যে নিহিত। (তিরমিজি – ১৮৯৯)
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন :
أفضل الصدقة رضا الوالدين
সবচেয়ে উত্তম সাদাকাহ হলো পিতা-মাতার সন্তুষ্টি অর্জন করা। (মুসনাদে আহমাদ – ৫৩৭২)
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতা-মাতা তাঁর মুবারক জন্মের পূর্বেই ইন্তেকাল করেছিলেন; তা সত্ত্বেও পিতা-মাতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের গুরুত্ব বিশ্ববাসীকে সবচেয়ে জোরালো ভাষায় তিনিই জানিয়ে গেছেন।
(খ) আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
من أراد أن يبسط له في رزقه ويبسط له في عمره فليصل رحمه
যদি কেউ চায় আল্লাহ তার রিজিক ও আয়ু প্রসারিত করুন তবে সে যেন তার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। (সহিহ বুখারি - ৫৯৮৬)
(গ) প্রতিবেশীর প্রতি সদয় আচরণ
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
من كان يؤمن بالله واليوم الآخر فلا يؤذي جاره
যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসী সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। (সহিহ বুখারি - ৬০১৩)
পরিবারের বাইরে আপন বংশ ও সম্প্রদায়, জাতি ও প্রতিবেশীর সঙ্গে সদয় আচরণ সমাজে শান্তি ও সংহতি বজায় রাখতে বিশেষ ভুমিকা রাখে।
(ঘ) আপন পরিবারের সঙ্গে সুন্দর আচরণ
তিনি পরিবারের প্রতি সর্বদা সুন্দর আচরণ করতেন এবং বিশ্ববাসীকে সেই সবক শিখিয়ে দিয়ে গেছেন
خيركم خيركم لأهله وأنا خيركم لأهلي
তোমাদের মধ্যে উত্তম হলো, যিনি তার পরিবারের প্রতি সেরা আচরণ করে এবং আমি আমার পরিবারের কাছে সেরা। (সহিহ বুখারি – ৬০৩৭)
স্ত্রী এবং পরিবারের সাথে ভালো আচরণ একজন মুসলমানের নৈতিকতার প্রতিফলন।
৬. দয়া ও সহানুভূতি
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা দুর্বল অসহায় ও শিশুদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করতেন।
ইরশাদ করেন:
من لا يرحم الناس لا يرحمه الله
যে মানুষের প্রতি দয়া করেনা আল্লাহ ও তার প্রতি দয়া করেন না (সহিহ বুখারি – ৬০১৬)
নবিজির চরিত্র সমাজে শান্তি, সংহতি এবং মানবিকতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মানুষের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা, ধৈর্য, দয়া ও সততা ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সমাজে অপরাধ, দ্বন্দ ও সংঘাত কমে আসে।
সর্বক্ষেত্রে উত্তম আদর্শ হওয়ার কারণে আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেছেন:
وإنك لعلى خلق عظيم
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা