বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
যুদ্ধক্ষেত্রে মহানবি ﷺ মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ
রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন আল্লাহ তাআলা কর্তৃক প্রেরিত সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। তাঁর মধ্যে মানবীয় গুণ ও নববি বৈশিষ্ট্যের এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছিল। প্রতিটি গুণে তিনি শ্রেষ্ঠত্বের সর্বোচ্চ মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ ছিলেন। ফলে তিনি নবুওয়াত ও রিসালাতের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বোত্তম ও সর্বোন্নত ছিলেন। তিনি মহান ও উৎকৃষ্ট চরিত্রের সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত ছিলেন। একাধারে তিনি শ্রেষ্ঠ সন্তান, শ্রেষ্ঠ স্বামী, শ্রেষ্ঠ পিতা, শ্রেষ্ঠ প্রতিবেশী, শ্রেষ্ঠ সেনাপতি এবং শ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন। যুগে যুগে সিরাত লেখক ও গবেষকগণ নবিজি সা. এর জীবনের এক একটি দিক সম্পর্কে বিশদ গবেষণা ও আলোচনা করেছেন। বক্ষমান প্রবন্ধে আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর কয়েকটি বিশেষ গুণ ও অসাধারণ নেতৃত্ব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করবো, ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ তাআলার উপর অবিচল আস্থা ও ভরসা
মুমিন কখনো কেবল সৈন্যসংখ্যা, বাহ্যিক শক্তি, রণকৌশল কিংবা অস্ত্রশস্ত্রের উপর নির্ভরশীল হতে পারে না। এর বাস্তব নিদর্শন ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ, যিনি প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রে—মুসলিমরা শক্তিশালী অবস্থানে থাকুক বা দুর্বল—আল্লাহর সাহায্যের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতেন।
বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে, যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম বিহীন মুসলিম বাহিনীকে শত্রুর মোকাবেলায় প্রস্তুত করে নবিজি ﷺ তাবুতে ফিরে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে আকুল চিত্তে ফরিয়াদ জানাতে লাগলেন: “হে আল্লাহ! আপনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা পূরণ করুন। হে আল্লাহ! আপনি যদি মুসলমানদের এই ক্ষুদ্র দলটিকে ধ্বংস করে দেন, তাহলে এ বিশ্বের বুকে আপনার ইবাদত করার মতো কেউ থাকবে না।”
রাসূলুল্লাহ ﷺ এভাবে গভীর আকুল কণ্ঠে ফরিয়াদ জানাচ্ছিলেন। ব্যাকুলতা এতো তীব্র ছিল যে, একপর্যায়ে নবিজির কাঁধ থেকে চাদর পড়ে যায়। তখন হযরত আবু বকর রা. চাদর তুলে দিয়ে বলেন: “হে আল্লাহর রাসুল! আপনি শান্ত হোন। আল্লাহর দরবারে আপনি যথেষ্ট আকুতি জানিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন।” (সহিহ মুসলিম : ১৭৬৩)
এটি কেবলমাত্র একটি যুদ্ধের বিশেষ পরিস্থিতির বিবরণ। এভাবে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর সাহায্যের প্রতি পরিপূর্ণ আস্থা ও আকাঙ্ক্ষা রাখতেন।
অসীম বীরত্ব ও সাহস
রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন সর্বাধিক বীরত্ব ও সাহসের অধিকারী। হযরত আলী রা. বলেন, আমার বদর যুদ্ধের কথা মনে পড়ে যখন যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করল, তখন আমরা রাসুলুল্লাহ ﷺ এর পিছনে আশ্রয় নিলাম। শত্রুর মোকাবেলায় সেদিন তিনি আমাদের সকলের মধ্যে সম্মুখভাগে ছিলেন এবং সবচেয়ে তীব্র লড়াইকারী ছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ : ৬৫৪)
এমনকি যুদ্ধ প্রচণ্ড আকার ধারণ করলে এবং অন্যান্যরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন শুরু করলেও তিনি পিছপা হতেন না। হযরত বারা ইবনুল আযিব রা. কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি হুনাইন যুদ্ধের দিন পলায়ন করেছিলেন? তিনি উত্তর দিলেন, রাসুলুল্লাহ সা. যুদ্ধক্ষেত্রে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেননি। তিনি আরো বলেন, যখন যুদ্ধ ভয়ংকর রূপ নিত, তখন আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পেছনে থেকে আত্মরক্ষা করতাম। আমাদের মধ্যে সাহসী তারাই ছিলেন, যারা নবিজির সঙ্গে থেকে লড়াই চালিয়ে যেতেন। (সহিহ মুসলিম : ১৭৭৬)
অসাধারণ নেতৃত্বগুণ
যুদ্ধক্ষেত্রে একজন সফল ও আদর্শ সেনাপতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণাবলির একটি হলো নেতৃত্ব। রাসুলুল্লাহ ﷺ বিশুদ্ধ মতানুযায়ী ২৭ টি যুদ্ধে স্বশরীরে অংশগ্রহণ করেছেন এবং এর মধ্যে ৯ টিতে শত্রুর সঙ্গে লড়াই হয়েছে। প্রতিটি যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর অসামান্য নেতৃত্বগুণ প্রকাশ পেয়েছে। এ সকল যুদ্ধে তিনি শুধু দিকনির্দেশনা দিয়ে ক্ষান্ত থাকেননি, বরং সহযোদ্ধাদের মনোবল বৃদ্ধি, সাহস সঞ্চার এবং আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থার মনোভাব সৃষ্টি করেছেন।
আধুনিক সমরবিদগণ যুদ্ধক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্যাবলি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিস্ময়াবিভূত হয়েছেন।
বদরের যুদ্ধে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শক্রমে পানির স্থান দখল Participative Leadership (অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব) এর অনুপম দৃষ্টান্ত। আধুনিক সমরতত্ত্বে যাকে “Consultative Command” বা “Command by Consensus” বলা হয়।
হুনায়নের যুদ্ধে অসীম সাহসিকতা ও মানসিক দৃঢ়তা তাঁর অসামান্য Crisis Leadership (সংকটকালীন নেতৃত্ব) এর জ্বলন্ত প্রমাণ। আধুনিক সমরতত্ত্বে একে বলা হয় “Crisis Leadership & Psychological Resilience।”
আহযাব যুদ্ধে ‘খন্দক’ বা পরিখা খননের মাধ্যমে শত্রুবাহিনীর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়া তাঁর অসাধারণ Innovation (উদ্ভাবনী কৌশল) এর বহিঃপ্রকাশ। আধুনিক সমরতত্ত্বে একে বলা হয় “Maneuver Warfare”।
বদর যুদ্ধের বন্দীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ, নবিজির Moral Authority (নৈতিক নেতৃত্ব) নির্দেশ করে। আধুনিক সমরতত্ত্বে একে “Ethical Leadership & Hearts-and-Minds Approach” বলে।
হুদাইবিয়ার সন্ধিতে বাহ্যিক দৃষ্টিতে নেতিবাচক শর্ত মেনে নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করা তাঁর Strategic Vision (কৌশলগত দূরদৃষ্টি) এর সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। আধুনিক সমর কৌশলে একে “Grand Strategy & Operational Art” বলা হয়।
উহুদ ও হুনায়ন যুদ্ধে বিপর্যয় সামাল দিয়ে সাহাবিদের পুনর্গঠিত করে পুনরায় লড়াইয়ে নির্দেশ প্রদান Command and Control (C2) (নির্দেশ ও নিয়ন্ত্রণ) এর একটি অনুপম উপমা, যা আধুনিক সমরতত্ত্বের “Command and Control Doctrine” -এর আদর্শ প্রতিফলন।
এভাবে আধুনিক সমরবিদগণ মহানবি ﷺ এর অসাধারণ যুদ্ধকৌশলের বিভিন্ন দিক ও অনুপম নেতৃত্বের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেছেন। সুতরাং, রাসুলুল্লাহ ﷺ কে বিশ্বের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন সমরবিদ আখ্যা দিলে মোটেই অত্যুক্তি হবে না।
সামরিক প্রজ্ঞা ও রণকৌশল
একজন সুদক্ষ ও দূরদর্শী সেনাপতির প্রধান অস্ত্র হলো সঠিক যুদ্ধকৌশল ও মোক্ষম রণনীতি। রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহপ্রদত্ত অতুলনীয় সামরিক প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে প্রতিটি যুদ্ধে যে অভিনব ও কার্যকরী রণকৌশল অবলম্বন করেছিলেন, তা এই আধুনিক যুগে এসেও সমরবিদদের বিস্মিত ও অভিভূত করে। বদর যুদ্ধে পানির উৎস দখলে রাখা, উহুদ যুদ্ধে পাহাড় পেছনে রেখে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বিশেষ তীরন্দাজ বাহিনী মোতায়েন করে ভৌগোলিক সুবিধা গ্রহণ, আহযাব যুদ্ধে মদিনার অভ্যন্তরে সেনা মোতায়েন করে শহরের প্রবেশমুখে ‘খন্দক’ (পরিখা) খননের মাধ্যমে শত্রুর আক্রমণ ঠেকিয়ে দেওয়া, হুদায়বিয়ার সন্ধিতে আপাতদৃষ্টিতে অসম্মানজনক শর্ত মেনে নিয়ে কৌশলগত মাস্টারস্ট্রোক, খাইবার যুদ্ধে শত্রুপক্ষের দুর্গগুলোর দুর্বল দিক উদঘাটন করে সে অনুযায়ী আক্রমণ করা এবং শত্রুপক্ষের উপর বিভিন্নভাবে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা, মক্কাবিজয় অভিযানে একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ করে শত্রুকে প্রতিরোধশূন্য করে ফেলা, হুনাইন যুদ্ধে সাহাবিদেরকে শত্রুর শক্তির দিক সম্পর্কে পূর্ব থেকে অবহিত করা এবং সাময়িক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠে বাহিনীর দ্রুত পুনঃবিন্যাস করা, তাবুকের যুদ্ধে প্রতিকূল আবহাওয়া ও সুদূর গন্তব্যে সীমিত রসদ ও বাহনজন্তুর কৌশলী ব্যবহার এবং শত্রুর অন্তরে ভীতিসঞ্চারের মাধ্যমে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে আসতে বাধা প্রদান করা, বিভিন্ন যুদ্ধে গোয়েন্দাদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ—নবিজি ﷺ এর অনুপম রণকৌশলের এক একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
শারীরিক শক্তি ও মানসিক দৃঢ়তা
একজন সেনাপতির শারীরিক শক্তি ও মানসিক দৃঢ়তা বাহিনীর মনোবলকে বহুগুণে বৃদ্ধি করে। রাসুলুল্লাহ ﷺ ছিলেন শারীরিকভাবে বলবান এবং মানসিকভাবে দৃঢ় ও অবিচল। আহযাব যুদ্ধে পরিখা খননকালে যখন প্রচন্ড শক্ত পাথর খনন কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াল, সাহাবিগণ নবিজি ﷺ কে এ বিষয়ে অবগত করলে তিনি বললেন, “আমি নিজে খন্দকে নামবো।” অথচ অনাহারের দরুন নবিজির পেটে তখন পাথর বাঁধা। রাসুলুল্লাহ ﷺ স্বহস্তে কোদাল ধারণ করে পাথরটিতে আঘাত করা মাত্র সেটি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে বালুকারাশিতে পরিণত হলো। এটি তাঁর আল্লাহপ্রদত্ত তাঁর অসামান্য শারীরিক শক্তিমত্তার অনন্য দৃষ্টান্ত।
শারীরিক শক্তির পাশাপাশি তিনি মানসিক দৃঢ়তার অধিকারী ছিলেন। উহুদ যুদ্ধে কাফের বাহিনী মুসলমানদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারলেও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারেনি বিধায় আবু সুফিয়ান তীব্র মনস্তাপে পুড়তে লাগল। তাই আবু সুফিয়ান পুনরায় মদিনা আক্রমণ করে মুসলমানদের পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার পরিকল্পনা করল। উহুদ যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পরদিন কাফেরদের এই চক্রান্তের ব্যাপারে জানতে পেরে রাসুলুল্লাহ ﷺ তাদের পিছু ধাওয়ার ঘোষণা দিলেন। সেই সাথে বলে দেয়া হল, গতকাল যারা লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করেনি তারা যেন এই যুদ্ধযাত্রায় অংশ না নেয়। এরপর ক্লান্ত ও আহত সাহাবিদেরকে সঙ্গে নিয়ে শত্রুর পশ্চাৎধাবনে বেরিয়ে পড়লেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ ও মুসলমানদের এই অসীম সাহস ও মানসিক দৃঢ়তা দেখে আবু সুফিয়ান পুনরায় আক্রমণের সাহস হারিয়ে ফেলল এবং ব্যর্থ মনোরথে মক্কায় ফিরে গেল।
উদারতা ও মানবিকতা
আল্লাহ তাআলা মহানবি ﷺ কে বিশ্বজগতের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। তাই যুদ্ধক্ষেত্রেও তিনি দয়া এবং উদারতার পরিচয় দিয়েছেন। সরাসরি লড়াইয়ে অংশগ্রহণ না করলে নারী, শিশু, নিরস্ত্র ও পলায়নরত ব্যক্তিকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে সদয় আচরণ করেছেন, সাহাবিদেরকেও তাদের সঙ্গে সদাচারের নির্দেশ দিয়েছেন। নবিজির প্রতি উৎসর্গপ্রাণ সাহাবিগণ এই নির্দেশ পেয়ে যুদ্ধবন্দীদের সাথে এমন উত্তম আচরণ করলেন, যার ফলে কেউ কেউ মুক্তি পাওয়ার পরপর ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমানদের সঙ্গে ইসলামের ছায়াতলে শামিল হলেন। বাকিদের মনেও রাসুলুল্লাহ ﷺ এর উদারতা ও মানবিকতার গভীর প্রভাব পড়ল, যা ভবিষ্যতে তাদের অনেকের ইসলাম গ্রহণের পেছনে প্রভাবক ভূমিকা পালন করেছিল।
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা