বর্ষ: ১, সংখ্যা: ২
জুমাদাল আখিরাহ ১৪৪৭ | সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর- ২০২৫
অনুপম শিক্ষক প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুফতি মুহাম্মাদ ফয়জুল্লাহ
আল্লাহ পাক রব্বুল আলামিন তাঁর শ্রেষ্ঠতম মাখলুক বনি আদমকে সৃষ্টি করার পর তাদের হেদায়েতের লক্ষ্যে হযরত আদম আঃ থেকে রহমতে দোআলম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত অসংখ্য নবী ও রাসুল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন ইলমে ইলাহির অফুরন্ত ঝর্ণাধারা, হেদায়েতের অপূর্ব প্রদীপ এবং তাওহিদ বা একত্ববাদের অতুলনীয় ঐশী শিক্ষক। উম্মাহকে পাঠদানের জন্য পাঠ্যপুস্তক হিসেবে আল্লাহ তায়ালা তাদের কাউকে দিয়েছিলেন সহিফা বা পুস্তিকা। বিশেষ কয়েকজনকে প্রদান করেছেন আসমানি গ্রন্থ বা কিতাব। সেগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও অনুপম গ্রন্থ আল কোরআন। আর আল্লাহপাক রব্বুল আলামিন যেহেতু আমাদের প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উক্ত গ্রন্থের শিক্ষক হিসেবে মনোনীত করেছেন এবং তাঁকে শ্রেষ্ঠ, সফল, আদর্শবান ও অনুপম শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলতে যত যোগ্যতা ও গুণের প্রয়োজন সবই তাঁকে দান করেছেন, তাই তিনি সর্বকালের সেরা অনুপম শিক্ষক। শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের শিক্ষক হিসেবে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে নির্বাচন করা হবে এটাই স্বাভাবিক। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মহাগ্রন্থ আল কুরআনের শিক্ষকতার গুরু দায়িত্ব অর্পণের ব্যাপারে আল্লাহ পাক রব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন,
هو الذي بعث في الأميين رسولا منهم يتلو عليهم آياته ويزكيهم ويعلمهم الكتابة والحكمة وإن كانوا من قبل لفي ضلال مبين
অর্থ: তিনি ঐ সত্তা যিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে এমন একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন যিনি তাদেরকে পাঠ করে শোনাবেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং শিক্ষা দিবেন কিতাব ও হেকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত। (সূরা জুমআ: ২)
এই আয়াতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করার তিনটি উদ্দেশ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এক: তিনি উম্মতকে কিতাব তথা কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করে শোনাবেন। দুই: উম্মতকে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সকল প্রকার অপবিত্রতা থেকে পবিত্র করবেন। তিন: উম্মতকে কিতাব ও হেকমত তথা কোরআন ও সুন্নাহ শিক্ষা দেবেন।
তিনি ছিলেন অনুপম শিক্ষক
শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তাঁর চরিত্র মাধুরী ও অনুপম আদর্শের ব্যাপারে প্রখ্যাত সাহাবি হযরত মুয়াবিয়া ইবনুল হাকাম রা: এর বর্ণনা:
عن معاوية بن الحكم السلمي، قال: بينا أنا أصلي مع رسول الله صلى الله عليه وسلم، إذ عطس رجل من القوم، فقلت: يرحمك الله فرماني القوم بأبصارهم، فقلت: واثكل أمياه، ما شأنكم؟ تنظرون إلي، فجعلوا يضربون بأيديهم على أفخاذهم، فلما رأيتهم يصمتونني لكني سكت، فلما صلى رسول الله صلى الله عليه وسلم، فبأبي هو وأمي، ما رأيت معلما قبله ولا بعده أحسن تعليما منه، فوالله، ما كهرني ولا ضربني ولا شتمني، قال: "إن هذه الصلاة لا يصلح فيها شيء من كلأم الناس، إنما هو التسبيح والتكبير وقراءة القرآن"
অর্থ, হযরত মুয়াবিয়া ইবনুল হাঁকা মআসসুলামী রা: বলেন আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে নামাজ আদায় করছিলাম, হঠাৎ এক ব্যক্তি হাঁচি দিল। আমি (তার জবাবে) يرحمك الله বললাম। লোকেরা (নামাজে হাচিঁর জবাব দিতে দেখে) রাগান্বিত হয়ে আমার দিকে আঁড় চোখে ইশারা করতে লাগলো। আমি তাদেরকে বললাম, তোমাদের মা তোমাদের কে কাঁদাক। কী ব্যাপার? তোমরা আমার দিকে এভাবে রাগান্বিত হয়ে তাকাচ্ছ কেন? এই কথা শুনে তারা হাত দ্বারা তাদের রানে আঘাত করছিল। অতঃপর যখন আমি বুঝলাম তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছে তখন আমি চুপ করলাম। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন নামাজ সমাপ্ত করলেন। (আমার পিতা-মাতা তাঁর ওপর কোরবান হোক) আগেপরে তাঁর চেয়ে উত্তম শিক্ষক আমি দেখিনি। আল্লাহর কসম! তিনি আমার সাথে রাগ করেননি, আমাকে প্রহার করেননি এবং আমাকে গালিও দেননি। বরং এতটুকু বলেছেন, এই জাতীয় নামাজে সাধারণত মানুষ যেভাবে কথা বলে সেভাবে কথা বলা ঠিক না। নামাজ হলো তাসবিহ, তাহলিল এবং কোরআন তেলাওয়াতের জন্য। সুবহানাল্লাহ! প্রিয় পাঠক, একটু ভাবুন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেমন ধৈর্যশীল এবং অনুপম আখলাকের অধিকারী শিক্ষক ছিলেন। (সহিহ মুসলিম – ৫৩৭)
তিনি ছিলেন সহজ পন্থার শিক্ষক:
কঠোরতা পরিহার এবং সহজতা প্রদর্শন করা যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বভাবগত প্রবণতা ছিল তা তিনি নিজেই ব্যক্ত করেছেন।
عن جابر بن عبد الله رضي الله عنه ان النبي صلى الله عليه وسلم قال ان الله لم يبعثني معنتا ولا متعنتا ولكن بعثني معلما ميسرا.
অর্থ: আল্লাহ পাক রব্বুল আলামিন আমাকে কঠোরতা আরোপকারী ও অত্যাচারীরূপে প্রেরণ করেননি। তিনি তো আমাকে সহজ পন্থার শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছেন। (সহিহ মুসলিম – ১৪৭৮)
অর্থাৎ উম্মাহর জন্য শরিয়তের বিধানকে শরিয়তের গণ্ডির মধ্যে থেকেই যতটুকু সম্ভব সহজভাবে উপস্থাপন করা এবং শরিয়তের বিধানকে প্রয়োগ করতে গিয়ে কঠোরতা পরিহার করে সহজ পন্থা অবলম্বন করা ছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্বভাব। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক কঠোরতা পরিহার করা এবং সহজ পন্থা অবলম্বন করা সংক্রান্ত একটি অপূর্ব ঘটনা হাদিসগ্রন্থের পাতা থেকে:
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قأم أعرابي فبال في المسجد، فتناوله الناس، فقال لهم النبي صلى الله عليه وسلم: «دعوه وهريقوا على بوله سجلا من ماء، أو ذنوبا من ماء، فإنما بعثتم ميسرين، ولم تبعثوا معسرين
অর্থ: হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার এক বেদুঈন মসজিদে পেশাব করে দিল। তখন লোকজন তাকে শাসন করার উদ্দেশ্যে উত্তেজিত হয়ে পড়ল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, তোমরা তাকে ছেড়ে দাও। এবং তার পেশাবের উপর এক বালতি অথবা এক পাত্র পানি ঢেলে দাও। কারণ তোমাদের সহজতা প্রদর্শনকারী রূপে প্রেরণ করা হয়েছে কঠোর ব্যবহারকারী রূপে পাঠানো হয়নি । (সহিহ বুখারি – ২২০)
এখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের উক্ত নব মুসলিম বেদুইনকে শাসনের পরিবর্তে সহযোগিতা করার আদেশ দিলেন। কারণ তিনি ছিলেন বাবাতুল্য শিক্ষক; যিনি সর্বদা সহজ পন্থা অবলম্বন করতেন। একজন জ্ঞানী ও দরদী বাবা যেমনিভাবে তার অবুঝ সন্তানদের হাত ধরে ধরে জীবনঘনিষ্ঠ প্রতিটি বিষয় শিক্ষা দেয়, তেমনিভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদেরকে সভ্যতা ও মানবতাসহ দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণকর প্রতিটি বিষয় শিখিয়েছেন।
তিনি ছিলেন ছোটদের শিক্ষক
শিশু সাহাবি হযরত ওমর ইবনে আবু সালামা রা., শৈশবে যিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে প্রতিপালিত হয়েছিলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তাঁকে শিক্ষাদানের একটি ঘটনা:
عمر بن أبي سلمة، يقول: كنت غلاما في حجر رسول الله صلى الله عليه وسلم، وكانت يدي تطيش في الصحفة، فقال لي رسول الله صلى الله عليه وسلم: "يا غلام، سم الله، وكل بيمينك، وكل مما يليك"
অর্থ : হযরত ওমর ইবনে আবু সালামা রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তত্ত্বাবধানে ছিলাম। একদা খাবারের বড় পাত্রের বিভিন্ন প্রান্তে আমার হাত ছোটাছুটি করছিল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে বালক, বিসমিল্লাহ বলে ডান হাতে খাও এবং (খাবার যেহেতু একই ধরনের তাই) তোমার সম্মুখ প্রান্ত হতে খাও। (সহিহ বুখারি – ৫৩৭৬)
খাবারের সময় সাধারণত বাচ্চাদের হাত পাত্রের বিভিন্ন দিকে ঘুরতে থাকে অর্থাৎ পাত্রে থাকা পছন্দনীয় ভালো ভালো খাবারগুলো তারা বেছে বেছে গ্রহণ করে। কয়েকজন একই পাত্রে একই ধরনের খাবারে অংশগ্রহণ করলে এভাবে বেছে বেছে খাওয়া শিষ্টাচার বহির্ভূত। উপরন্তু ছোটবেলায় যে অভ্যাস গড়ে ওঠে বড় হলেও অধিকাংশের ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকে। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শৈশবে তাকে খাবারের আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিলেন।
তিনি ছিলেন যুবক-যুবতীদের শিক্ষক
যুবক-যুবতীরা সাধারণত যৌবনের তাড়নায় প্রচুর ভুলের শিকার হয়। পদস্খলন থেকে তাদেরকে রক্ষা করার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বতন্ত্রভাবে পাঠদান করেছেন । বিখ্যাত সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. -এর বর্ণনায় :
عن عبد الله بن عباس رضي الله عنهما، قال: كان الفضل رديف رسول الله صلى الله عليه وسلم، فجاءت امرأة من خشعم، فجعل الفضل ينظر إليها وتنظر إليه، وجعل النبي صلى الله عليه وسلم، يصرف وجه الفضل إلى الشق الآخر
অর্থ : হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ফজল ইবনে আব্বাস রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাহনের পেছনে আরোহী ছিলেন। ইত্যবসরে খাসআম গোত্রের এক মহিলা রাসুলুল্লাহ সাঃ এর নিকট মাসাআলা জিজ্ঞেস করতে এলো। ফজল ইবনে আব্বাস মহিলার দিকে তাকাচ্ছিল, মহিলাও তার দিকে তাকাচ্ছিল। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজল ইবনে আব্বাসের চেহারা অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন। (সহিহ বুখারি – ১৫১৩)
এটা শুধু তাদের জন্যে শিক্ষা ছিল না; বরং কেয়ামত পর্যন্ত আগত-অনাগত সকল শ্রেণীর নর-নারীর জন্য শিক্ষা হয়ে থাকলো যে, এ ধরণের পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে নজর হিফাজত করতে হবে; অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিতে হবে। দৃষ্টিকে দীর্ঘায়িত করে গুনাহে লিপ্ত হবে না।
তিনি ছিলেন নারীদের শিক্ষক
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী জাতির শিক্ষার বিষয়টিও যথাযথ গুরুত্ব সহকারে আঞ্জাম দিয়েছেন। তাদের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় সকল শিক্ষা-দীক্ষার আয়োজন ঘরোয়াভাবে কিংবা সুযোগমত কোনো মজলিসে নিজে বা অন্যের মাধ্যমে করেছেন। নারীদের শিক্ষাদানের একটি খণ্ডচিত্র প্রখ্যাত মহিলা সাহাবিয়া হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা. বর্ণনায় :
عن أسماء بنت عميس، قالت: كنت صاحبة عائشة التي هيأتها وأدخلتها على رسول الله صلى الله عليه وسلم ومعي نسوة قالت: فوالله ما وجدنا عنده قرى إلا قدحا من لبن، قالت: فشرب منه ثم ناوله عائشة فاستحيت الجارية فقلنا: لا تردي يد رسول الله صلى الله عليه وسلم خذي منه فأخذته على حياء فشربت منه، ثم قال: ناولي صواحبك فقلنا: لا نشتهيه فقال: " لا تجمعن جوعا وكذبا " قالت: فقلت يا رسول الله: إن قالت إحدانا لشيء تشتهيه لا أشتهيه يعد ذلك كذبا قال: " إن الكذب يكتب كذبا حتى تكتب الكذيبة كذيبة
অর্থ : হযরত আসমা বিনতে উমাইস রা. বলেন, আমি আয়েশা রা. এর ঐ বান্ধবী যে তাঁকে (নতুন বউ হিসেবে সাজিয়ে স্বামীর ঘরে যাওয়ার জন্য) প্রস্তুত করেছে এবং তাঁকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে। অবশ্য আমার সাথে আরও কয়েকজন মহিলা ছিল। হযরত আসমা বলেন, আল্লাহর শপথ আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে এক পেয়ালা দুধ ব্যতীত মেহমানের আপ্যায়নের জন্য উপযুক্ত কিছুই পাইনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেয়ালা থেকে প্রথমে পান করে আয়েশাকে পান করার জন্য দিলেন। কিন্তু তিনি (কুমারী নতুন বউ তাই) লজ্জার কারণে গ্রহণ করছিলেন না। আমরা বললাম রাসুলের হাতে দেয়া জিনিস ফিরিয়ে দিও না, গ্রহণ করো। আয়েশা রা. লজ্জায় অবনত হয়ে তা গ্রহণ করলেন সেখান থেকে পান করলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশাকে বললেন, এখন তোমার বান্ধবীদের দাও। আমরা বললাম, আমাদের চাহিদা নেই। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আমাদের লৌকিকতা অনুধাবন করে) আমাদেরকে বললেন, তোমরা ক্ষুধা এবং মিথ্যাকে একত্রিত করো না। হযরত আসমা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহা বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের কেউ যদি কোন বিষয়ে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বলে যে আমার চাহিদা নেই, তাহলেও কি এটাকে মিথ্যা বলে গণ্য করা হবে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মিথ্যাকে মিথ্যা বলেই লেখা হবে । এমনকি ছোট মিথ্যাকেও ছোট মিথ্যা বলেই লেখা হবে। (মুসনাদে আহমাদ – ২৭৪৭১)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পেরেছিলেন আসলে তাদের ক্ষুধা আছে। কিন্তু লজ্জা আর লৌকিকতা হেতু তারা সেটা প্রকাশ করতে পারছেন না। বলছেন ,আমাদের খাবারের চাহিদা নেই। নবিজি তাঁদের বোঝালেন, লৌকিকতা প্রদর্শনের কারণে একে তো খাবার থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণা ভোগ করছ, আবার অযথা মিথ্যা বলার কারনে গুনাহের ভাণ্ডারকেও সমৃদ্ধ করছো।
তিনি ছিলেন সকলের শিক্ষক
প্রসিদ্ধ সাহাবি হযরত সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত:
عن سلمان، قال: قال لنا المشركون إني أرى صاحبكم يعلمكم حتى يعلمكم الخراءة، فقال: أجل «إنه نهانا أن يستنجي أحدنا بيمينه، أو يستقبل القبلة، ونهى عن الروث والعظام» وقال: «لا يستنجي أحدكم بدون ثلاثة أحجار»
অর্থ: হযরত সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার মুশরিকরা আমাদেরকে বলল, তোমাদের সাথী (নবী মুহাম্মদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তোমাদের পেশাব-পায়খানা করতেও শেখাচ্ছে দেখছি! (জবাবে) তিনি বলেন, হ্যাঁ। তিনি আমাদেরকে ডানহাতে ইস্তিঞ্জা করতে নিষেধ করেছেন। (ইস্তিঞ্জার সময়) কেবলামুখী হতেও নিষেধ করেছেন। ইস্তিঞ্জায় গোবর এবং হাড্ডি ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন। এবং এ-ও বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন ইস্তিঞ্জায় তিনটি পাথরের কম ব্যবহার না করে। (মুসলিম - ২৬২)
সালমান ফারসি রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায় যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামদের জীবনের প্রয়োজনীয় সমস্ত শিক্ষাই দিয়েছেন; এমনকি অতি তুচ্ছ অথচ মানবিক প্রয়োজন তথা ইস্তিঞ্জার আদব বা শিষ্টাচারও শিখিয়েছেন। যেহেতু ইসলাম সার্বজনীন বা পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। তাই ব্যক্তি জীবন থেকে আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় সাহাবায়ে কেরামদেরকে হাতে কলমে শিখিয়েছেন।
এভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সভ্যতা ও মানবতার শিক্ষা ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব এবং গোলাম-মনিবসহ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছেন।
প্রিয় পাঠক! রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষকতার সূচনা হয়েছিল এমন এক বর্বর ও মূর্খ জাতিকে পাঠদানের মাধ্যমে, যারা আপন কন্যাকে জীবন্ত দাফন করতো, অন্যায় ভাবে মানুষ হত্যা করতো, কাফেলা লুণ্ঠন করতো, আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করতো, জিনা-ব্যভিচার করতো এবং উলঙ্গ হয়ে আল্লাহর ঘর তাওয়াফ করতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্বল্প সময়ের শিক্ষা ও সান্নিধ্যে গ্রহণ করে ওইসব বর্বর মানুষ নক্ষত্রতুল্য এমন এক সোনালী কাফেলায় পরিণত হয়েছিলেন যে গোটা পৃথিবী তাদের জ্ঞান-প্রজ্ঞা, সভ্যতা ও সংস্কৃতি, মানবতা ও ন্যায়বিচার, নৈতিকতা ও চরিত্র মাধুরী এবং উৎকৃষ্ট আচার-বিচারে মুগ্ধ। তারা পরিণত হয়েছিলেন এমন মহামানবে যে, পৃথিবী কোনকালে তাঁদের মত আদর্শবান ও ন্যায়নিষ্ঠ কাফেলা উপমা হাজির করতে পারে নি। কীভাবে পারবে! পরশ পাথরতুল্য সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মহামানব ছিলেন তাঁদের শিক্ষক, খোদ রব্বুল আলামীন তাঁদের পরীক্ষা গ্রহণ করে সন্তোষজনক সর্বোচ্চ ফলাফলের সার্টিফিকেট দিয়ে বলেছেন- رضي الله عنهم ورضوا عنه । আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তাঁরাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট।
অতএব, পৃথিবীতে যে মানুষ সফল ও আদর্শবান শিক্ষক হওয়ার প্রত্যাশী তার উচিত শিক্ষকতার প্রতিটি ধাপে রাসুলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শ অনুসরণ করা। তাহলেই অর্জিত হবে সফলতার রাজমুকুট। সাম্রাজ্য বিস্তৃত হবে পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে, প্রতিটি মানব হৃদয়ে।
"শান্তি ও নিরাপত্তা সংকট এবং সিরাতে তাইয়্যিবার আলোকে সমাধান" —ড. বশির আহমদ রিন্দ
রাসুল (সা.) এর জন্মতারিখ এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ লেখক: মুফতি রেজাউল হক দা.বা. শায়খুল হাদিস ও মুফতি, জামিয়া দারুল উলুম যাকারিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা